আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মারধরে নিহত: খেলা নিয়া মানুষটারে এইভাবে মাইরা ফালাইবো
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ২১:১১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

কাজের খোঁজে প্রায় আট মাস আগে কুমিল্লায় আসেন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা গ্রামের বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম (৩৮)। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন স্ত্রী বিউটি বানু ও দুই কন্যাসন্তানকে। কুমিল্লা নগরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মঠপুষ্করনী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (মিশুক) চালাতেন তিনি। প্রতিদিন মালিকের জমা শেষে যা থাকত, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার।
টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় তুচ্ছ ঘটনার জেরে নিহত হয়েছেন একমাত্র উপার্জনকারী শরিফুল ইসলাম। আর্জেন্টিনা ও মিসরের খেলা চলাকালে স্থানীয় কয়েকজন তরুণের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ানোর পর তাঁদের মারধরে শরিফুল মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় মহসিন মিয়ার দোকানে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই অটোরিকশাচালককে মারধর করা ব্যক্তিরা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন। আর মারা যাওয়া অটোচালক শরিফুল মঙ্গলবার রাতের খেলায় মিসরের সমর্থন করলেও তিনি মূলত ব্রাজিল সমর্থক।
এ ঘটনার পর শরিফুলের পরিবারের সদস্যদের কান্না থামছে না। তাঁর স্ত্রী বিউটি বানু আহাজারি করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। বুধবার দুপুরে ভাড়া বাসায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিউটি বানু বলেন, ‘খেলা নিয়া মানুষটারে এইভাবে মাইরা ফালাইবো, এইটা কেমন কথা? আমার দুইডা মাইয়া ছাওয়াল। এহন কারে বাবা কইয়া ডাকবো? আমার দুইডা মাইয়া এতিম হইয়া গেল। যারা আমার স্বামীরে খুন করছে, মুই তাদের কঠিন বিচার চাই। মুই গরিব-অসহায় মানুষ, এহন এই দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু? হামার গোটা পরিবারডাই শেষ হইয়া গেল।’
শরিফুলের দুই মেয়ে নীলফামারীতে থাকা অবস্থায় পড়াশোনা করত। বড় মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি আর ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শরিফুল চেয়েছিলেন মেয়েদের কুমিল্লায় স্কুলে ভর্তি করতে। কিন্তু তাঁর সেই আশা আর পূরণ হলো না।
ঘটনার খবর পেয়ে নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় ছুটে এসেছেন শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান, শাশুড়ি নুর বানু, ভাই সাইফুল ইসলামসহ স্বজনেরা। বুধবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শরিফুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এদিন বিকেলে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। কিন্তু বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এ ঘটনায় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় কোনো মামলা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ।
মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন কোতোয়ালি মডেল থানার ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ উপপরিদর্শক সংকর কান্তি দাস। বুধবার তিনি বলেন, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কে বাদী হবেন, তা ঠিক করে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আটকের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও শরিফুলকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন আরেক অটোরিকশাচালক। তিনিও নীলফামারীর বাসিন্দা। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, তাঁরা সবাই মহসিন মিয়ার চায়ের দোকান খেলা দেখছিলেন। অনেক মানুষ ছিল। খেলার শুরুতে মেসি পেনাল্টি মিস করলে শরিফুল আর্জেন্টিনার এক সমর্থককে বলেন, ‘তোমার বাপে তো গোল দিতে পারল না’। মূলত এই কথা থেকেই বাগ্বিতণ্ডা শুরু। সেখানেই শরিফুলকে তাঁরা কয়েকজন মারধর করেন। হামলাকারীরা স্থানীয় দেখে শরিফুল এক পর্যায়ে পাশের একটি মেসে চলে যান। তখন সেখানে গিয়েও তাঁকে মারধর করা হয়। এরপর দোকানের সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শরিফুল। তাঁরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর থেকেই চা দোকানি মহসিন মিয়ার দোকান বন্ধ আছে। বুধবার সকালে তিনি ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তাঁরা ধরেননি। দুপুরের পর থেকে মুঠোফোন বন্ধ। শরিফুলকে মারধরে মূল হোতা হিসেবে যেই দুজন তরুণের নাম সামনে এসেছে, তাঁরাও এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। এ ছাড়া ওই দুই তরুণের পরিবার শরিফুলের পরিবারকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান বলেন, ‘গতকাল রাতে আমাকে কল করে বলা হয়েছে, দ্রুত কুমিল্লা আসতে হবে জামাই অসুস্থ। আমরা ইমার্জেন্সি কুমিল্লা এলাম। এসে দেখলাম শরিফুলের লাশ। এটা কোন সমাজ আর কেমন দেশ? খেলার সময় কথা–কাটাকাটির জেরে একজন মানুষকে মেরে ফেলবে? আমার মেয়েটা এখন দুইটা কন্যাসন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচবে? আমরা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এলাকার উঠতি বয়সী তরুণ। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যে খেলা শেষে বাগ্বিতণ্ডা হয়। তখন শরিফুলের মাথায় কিল-ঘুষি মারা হয়। পরে শরিফুলকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরার চেষ্টা করছে।
আমার বার্তা/এমই
