টঙ্গীর মাদরাসার ঘটনায় উভয়পক্ষের মামলা, সুষ্ঠু তদন্ত দাবি

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  গাজীপুর প্রতিনিধি

গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। এদিকে ওই শিক্ষককে মারধর, মাদরাসার কার্যালয়ে ভাঙচুর ও ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে শিশুটির বাবাসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিশুটির বাবা।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মামলার বিষয়টি গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান।

শুক্রবার রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলাটি করেন ক্বারিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ আলমাস হোসেন। মামলায় ছাত্রীর বাবাসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

এজাহারে বলা হয়েছে, যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে খণ্ডকালীন শিক্ষক মুসলেউদ্দিনকে কার্যালয়ে মারধর করা হয়। এ সময় নিরাপত্তাপ্রহরীকেও মারধর, অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, ভাঙচুর এবং জমি কেনার জন্য রাখা ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আলমাস হোসেন বলেন, মুসলেউদ্দিন প্রতিদিন মাত্র তিন ঘণ্টা খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতেন। তাকে উপাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। উপাধ্যক্ষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে থাকায় মাদরাসায় ছিলেন না। এ সুযোগে বহিরাগতদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। ১৭ লাখ টাকা লুটের প্রমাণও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষককে মারধর এবং প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের করা মামলায় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন শিশুটির বাবা। একই সঙ্গে মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন তিনি।

শুক্রবার দিবাগত রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের বিচার চাইতে মাদরাসায় গিয়েছিলাম, মব সৃষ্টি করতে নয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আমি নাকি মব সৃষ্টি করেছি এবং ফ্ল্যাট দখল করতে গিয়েছি। আমি কেন মব সৃষ্টি করব? আমি তো একজন বাবা হিসেবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে গিয়েছিলাম।

ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে শিশুটির বাবা বলেন, সেখানে একটি ছোট কাচের গ্লাস ভেঙেছিল, তবে সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা হয়নি। এর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মাদরাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছি, সেটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যাচাই করা হোক। মাদরাসায় এত টাকা কীভাবে রাখা হয়, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোরও সুষ্ঠু তদন্ত হোক।

অধ্যক্ষকে আগেই অভিযোগ জানিয়েছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে আমি তিন দিন আগেই অধ্যক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। আমি তার কক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। পরে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে এমন আচরণ করেছেন, যেন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতেই চান না।

শিশুটির বাবা জানান, দ্বীনি শিক্ষার জন্যই মেয়েকে ওই মাদরাসায় ভর্তি করেছিলেন। তিনি মাদরাসা বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নন, তবে সেখানে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। 

তিনি বলেন, আমি ইসলাম বা প্রকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলছি না। যারা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করে এবং সত্য আড়াল করার চেষ্টা করে, আমি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি।

নিজের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আইন যদি মনে করে আমি অপরাধী, তাহলে আইন অনুযায়ী যে শাস্তি হবে, তা মেনে নেব। তবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার চাই।

শিশুটির পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাত বছর বয়সী মেয়েটি টানা তিন দিন মাদরাসায় যাচ্ছিল না। এর কারণ জানতে চাইলে সে পরিবারকে মাদরাসার সহকারী প্রধান শিক্ষক মুসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জানায়।

বিষয়টি জানার পর বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে শিশুটির অভিভাবকেরা টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার শফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোডে অবস্থিত মাদ্রাসায় যান। তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। পরে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারাও সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে ওই শিক্ষককে মারধর করেন শিশুটির বাবা। খবর পেয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মুসলেউদ্দিনকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। পরে শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে করা মামলায় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে শিক্ষককে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়িটি নিয়ে পক্ষে-বিপেক্ষ আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। 

টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, মাদরাসার এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তার পরিবারের করা মামলায় এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ছাত্রীর বাবাকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেছে। ওই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ওসি আরও বলেন, উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছে। পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।