বাজেট ২০২৬-২৭: ভ্যাট থেকেই ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

পরোক্ষ কর তথা মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়েই চলেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতকে রাজস্ব আহরণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরতে যাচ্ছে সরকার। নতুন অর্থবছরের জন্য শুধু ভ্যাট থেকেই ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে, যা মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণ এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যেই ভ্যাট আহরণে এই জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকার মনে করছে, তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ভিত্তি থাকায় ভ্যাট খাত থেকেই দ্রুত রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
সূত্রটি জানিয়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণের চাপের পাশাপাশি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা করার পাশাপাশি বড় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
নতুন অর্থবছরের জন্য মোট ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হতে পারে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪১ হাজার কোটি টাকা বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ রাজস্ব আহরণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে কর খাত থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হতে পারে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে কর রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যেখানে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের বড় একটি অংশ পার হলেও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের প্রধান ভরসা হিসেবে ধরা হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতকে। এ খাত থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। এছাড়া আয়কর থেকে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং শুল্ক থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কর-বহির্ভূত রাজস্ব খাতেও প্রবৃদ্ধির আশা করা হলেও সেখানেও রয়েছে দুর্বলতা। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ খাতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা, যেখানে সংশোধিত লক্ষ্য ২০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এই খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
এদিকে, নন-ট্যাক্স রেভিনিউ (এনটিআর) খাতেও বড় লক্ষ্য ধরা হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ খাতে আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের সংশোধিত লক্ষ্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা হলেও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এই প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের জন্য আরও উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণকে অনেকেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত দুর্বলতা, সীমিত করজাল, কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা দীর্ঘদিন ধরেই বড় বাধা হয়ে আছে। এরপরও আইএমএফের শর্ত পূরণে রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, লক্ষ্য অর্জনে আগামী অর্থবছরে করজাল সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। তবে রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে সহজ পথ হলো পরোক্ষ কর বা ভ্যাট, তাই আগামী অর্থবছরেও এই খাতে থেকে বড় আয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
