ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাইলফলকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং বা 'ফিজিক্যাল স্টার্টআপ' কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর অভিজাত ক্লাবে নিজের নাম লেখাল।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফকির মাহবুব আনাম এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ যৌথভাবে বাটন চেপে রিয়্যাক্টরে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং রুশ ফেডারেশনের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, 'আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের দীর্ঘযাত্রার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এই প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত করার মাধ্যমে শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।'
রোসাটম-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টরে জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রাণ পেল। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল হবে অন্তত ১০০ বছর, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এবং আগামী বছর সেখানেও স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
রূপপুরে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ‘ভিভিইআর-১২০০’ জেনারেশন থ্রি প্লাস প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। দুটি ইউনিট থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। রিয়্যাক্টরে জ্বালানি লোড করতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগবে এবং সব পরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টের শুরুতে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী জানান, ১৯৬১ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারণা প্রথম আলোচিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে পারমাণবিক গবেষণার যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল, আজকের অর্জন তারই ফসল বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। বর্তমানে ৯০০-এর বেশি উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি কর্মী এই কেন্দ্রের দক্ষ জনবল হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া।এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে। এখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ কত পড়বে সে বিষয়ে এখন কোন পক্ষ থেকেই কিছু বলা হচ্ছে না।
বর্তমানে পৃথিবীর ৩১টি দেশে ৪১৬টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। সেগুলো থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ মোট উৎপন্ন বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশ। ১৫টি দেশে আরও ৬৩টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রই নির্মাণ করা হচ্ছে বাংলাদেশসহ নবাগত দেশসমূহে।
আমার বার্তা/এমই
