ব্যবসায়ী-হিসাববিদ-আইনজীবী দিয়ে সাজানো হচ্ছে বিএসইসি কমিশন
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১৩:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির চার কমিশনার পদত্যাগ করেছেন। তাদের জায়গায় নতুন চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে একটি বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ এক ব্যক্তি নিয়োগ পেতে পারেন। যিনি একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করেছেন।
অন্যদিকে, বিএসইসির কমিশনার হিসেবে একজন নারী আইনজীবী নিয়োগ পেতে পারেন। পাশাপাশি পেশাদার হিসাববিদ এবং ব্রোকারেজ হাউসের একজন প্রতিনিধি থাকতে পারেন নতুন কমিশনারদের তালিকায়।
নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বিএসইসি কার্যালয়ে যাবেন বলে সূত্রের তথ্যে জানা গেছে।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও চার কমিশনারের পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন আজই জারি করা হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দিয়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।
দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ কার্যকরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। একই সঙ্গে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের বিষয় রয়েছে।
তিনি জানান, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ বিষয়ে কার্যক্রম চলছে। প্রাথমিকভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে বহুজাতিক একটি কোম্পানির শীর্ষ এক ব্যক্তি রয়েছেন। আর কমিশনার হিসেবে পেশাদার হিসাববিদ, আইনজীবী ও ব্রোকারেজ হাউজের প্রতিনিধি থাকতে পারেন।
তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে আজই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিএসইসির চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং তার চার কমিশনার মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো. সাইফুদ্দিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা, বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষ এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ নানান মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। তবে পদত্যাগের বিষয়ে কমিশনারদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক মাস ধরে শেয়ারবাজারে লেনদেন ও সূচকের দুর্বলতা, বাজারে আস্থার সংকট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
পদত্যাগের বিষয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে রাশেদ মাকসুদ বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম অস্থির সময়ে তিনি ও তার সহকর্মীরা কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাজারের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সংস্কার এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, গত ২১ মাসে কমিশন পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরির জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে মার্জিন ঋণ, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ঋণপত্র এবং হুইসেলব্লোয়ার–সংক্রান্ত পাঁচটি বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স, অডিট এবং করপোরেট পুনর্গঠন বিষয়ে তিনটি খসড়া বিধিমালা ও নির্দেশিকা জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।
রাশেদ মাকসুদ আরও জানান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন এবং ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়া প্রস্তুত করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। তার মতে, এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, তার নেতৃত্বে কমিশন বাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কমপ্লায়েন্স ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করেছে। বাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের চর্চা কমিয়ে এনে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং বাজার অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি নিয়মভিত্তিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারী সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও কমিশনের অন্যতম অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও প্রতিযোগিতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রাশেদ মাকসুদের দায়িত্বকালজুড়ে দেশের পুঁজিবাজার নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। বাজারে ধারাবাহিক দরপতন, লেনদেনের নিম্নমুখী প্রবণতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়া, অনেক কোম্পানির শেয়ার দর দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমুখী থাকা এবং বাজার পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জোরালো হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএসইসির ওপর চাপও বৃদ্ধি পায়। বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ কমিশনের কার্যকারিতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আমার বার্তা /জেএইচ
