মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবারও সতর্ক অবস্থানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

কাল মুদ্রানীতি ঘোষণা

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ১২:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

মূল্যস্ফীতি এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না নামায় নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতেও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারও সংকোচনমূলক নীতির ধারা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে বড় বাজেট, প্রণোদনা কর্মসূচি, তারল্য সহায়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার কার্যক্রম অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি করে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আগামীকাল বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় নতুন মুদ্রানীতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার আগের অবস্থানেই রাখা হতে পারে। কারণ সম্প্রসারণমূলক পদক্ষেপ নিলে বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থাকায় এর চাপ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই বিস্তৃত হয়েছে।

এদিকে নতুন অর্থবছরের বড় বাজেট এবং প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাজারে চাহিদা ও অর্থপ্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার কমিয়ে আরও সম্প্রসারণমূলক অবস্থানে যাওয়া সমীচীন হবে না। সম্প্রসারণমুখী রাজস্বনীতির পাশাপাশি সহজ মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সতর্ক বা ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করতে পারে। ফলে আসন্ন মুদ্রানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তবে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটি সম্ভব নয়। করব্যবস্থা, রাজস্বনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে পড়ে। একই সময়ে উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, নীতি সুদহার ১ শতাংশ কমিয়ে ৯ শতাংশে আনা হলে বেসরকারি খাতে ঋণ, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরতে পারে। পাশাপাশি কর কাঠামোর সংস্কার এবং বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করারও পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোপুরি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে যায় এবং নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়। আর স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) নিম্নসীমা ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়।

নতুন মুদ্রানীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, অর্থবছর শুরুর আগেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।


আমার বার্তা /জেএইচ