গ্যাসের চাপ বাড়ায় চালু হচ্ছে কারখানা, তবে শঙ্কা কাটেনি
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৯ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

তীব্র গ্যাস সংকটে কয়েক দিন ধরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পর দেশের কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিতাস গ্যাসের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক ও সরকারের তৎপরতায় আজ রোববার বিকেল থেকে গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্ধ থাকা বেশির ভাগ কারখানা পুনরায় চালু হয়েছে এবং সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করেছে। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, এই উন্নতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, দেশে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার পর গ্যাস ঘাটতির বড় চাপ এখনও শিল্প খাতকেই বহন করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ব্যবসায়ীরা তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর পর বিকেল থেকে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে থাকে। তাদের মতে, বর্তমান চাপ বজায় থাকলে এই ধারাতেই কারখানা সচল রাখা সম্ভব হবে। তবে গ্যাসের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবং শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক করতে গ্যাস সরবরাহে এখনই সুষম বণ্টন ব্যবস্থা প্রয়োজন। না হলে আবারও শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার পর দেশে যে গ্যাস ঘাটতি তৈরি হয়েছে, এর বড় অংশের চাপ পড়েছে শিল্প খাতের ওপর।
উদ্যোক্তারা জানান, সমুদ্রে ভাসমান পুনরায় গ্যাসীকরণ ইউনিট বা এফএসআরইউ বিভ্রাটের আগে দেশে দৈনিক এলএনজি সরবরাহ ছিল এক হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সে সময় বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ করা হতো ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ কমে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এলেও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহে কোনো পরিবর্তন হয়নি; এখনও প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সার কারখানাগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ফলে এলএনজি আমদানিতে তৈরি হওয়া দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতির বড় চাপ শিল্প খাতকে বহন করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দেশের বৃহত্তম গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাসের আওতাভুক্ত শিল্পকারখানাগুলো। সংকট শুরুর আগে তিতাসের আওতাভুক্ত শিল্প খাত প্রতিদিন এক হাজার ৪২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও বর্তমানে পাচ্ছে মাত্র ৬১৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ, এককভাবে তিতাসের শিল্প খাতেই সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি সমকালকে বলেন, দুপুরের দিকে গ্যাসের চাপ দুই পিএসআই থাকলেও বিকেলের পর তা বেড়ে তিন পিএসআই হয়েছে। এই চাপ কারখানা সচল রাখার জন্য মোটামুটি যথেষ্ট। গ্যাস সংকটের কারণে দিনের প্রথম ভাগে উৎপাদন ব্যাহত হলেও দুপুরের পর থেকে কারখানাগুলো আবার উৎপাদন শুরু করতে পেরেছে।
তিনি বলেন, পাইপলাইনের ব্যাসের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের চাপের কিছুটা তারতম্য হয়। কোথাও ৮ ইঞ্চি, আবার কোথাও ৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন রয়েছে। তাঁর কারখানাটি লাইনের একেবারে শেষ প্রান্তে। সেখানে যদি গ্যাসের চাপ তিন পিএসআই থাকে, তাহলে অন্যান্য কারখানায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হওয়ার কথা।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে গ্যাসের চাপ দুই পিএসআইয়ের কাছাকাছি থাকায় কারখানাগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
বিটিএমএর পরিচালক এবং সংগঠনটির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সমকালকে বলেন, গ্যাসের চাপের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে বয়লারগুলো পর্যাপ্ত লোড নিতে পারছে না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যে বয়লারের এক হাজার ৫০০ লোড নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, সেটি বর্তমানে মাত্র ৬০০ লোড নিতে পারছে। দুটি জেনারেটরের মাধ্যমে কাজ চললেও সামগ্রিক গড় উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর দুটি কারখানাই উৎপাদনে ফিরেছে। তবে অনেক কারখানা এখনও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সংকট কাটিয়ে ওঠার উপায় খুঁজতে শিল্প মালিকরা নিয়মিত সভা ও আলোচনা করছেন।
ভোগ্যপণ্যের বাজারে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) প্রায় ৫৭টি কারখানা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ নিত্যপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। গ্যাস সংকটের কারণে কয়েক দিন তাদের চিনি কারখানাসহ বেশির ভাগ শিল্প ইউনিট বন্ধ ছিল। তবে গতকাল গ্রুপটির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার এস এম মুজিবুর রহমান বলেন, চিনি কারখানাসহ তাদের সব শিল্প ইউনিট চালু হয়েছে। সেগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রমও সচল রয়েছে।
তবে আরেক শীর্ষ ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তসলিম জানান, তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ বাড়েনি। এখনও তাদের কারখানার বয়লারে গ্যাসের চাপ এক পিএসআইর কম।
গাজীপুর জেলা ও মহানগরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যায় এসব কারখানার অনেকগুলোতেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকরা কাজে আসছেন, আবার কাজ না থাকায় ফিরেও যাচ্ছেন। যদিও এই অঞ্চলের কারখানাগুলোতেও গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
আমার বার্তা/এমই
