ইরান ভেনেজুয়েলা নয় যে সহজে জিতবেন ট্রাম্প

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ‘জয়’— বারবার এমন কথাই বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াইরত ইরানের আদর্শিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেতার সহজ কোনো পথ নেই যুক্তরাষ্ট্রের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা হলে তেহরান তাৎপর্যপূর্ণভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারে। গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কিংবা ২০২০ সালে দেশটির শীর্ষ সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।

তেহরানের কঠোর জবাবের শঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালালেও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে আরও অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ালে তা যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলের জন্যই মারাত্মক ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

স্টিমসন সেন্টার থিংক ট্যাংকের গবেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘সব বিকল্পই ভয়াবহ। একটির পর আরেকটি পদক্ষেপের পরিণতি কী হবে, তা অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। শাসনব্যবস্থা যদি মনে করে তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ও মিত্রদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।’

ট্রাম্পের সুর বদল

চলতি বছরের শুরু থেকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জোরদার হলে ট্রাম্প হুমকি দেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। গত ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র‘প্রস্তুত ও সজ্জিত’ রয়েছে।

পরের দুই সপ্তাহে তিনি এই হুমকি বারবার পুনরাবৃত্তি করেন এবং বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানান। তবে সরকারি অভিযানে ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়ালেও এবং দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলেও, ট্রাম্প পরে কিছুটা সুর নরম করেন। তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার জবাবে পাল্টা গুলি চালানো হয়েছে।

তবে পরিস্থিতি আপাতত কিছুটা শান্ত হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট শেষ হয়ে যায়নি। ইরানে আবারও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে, আর ট্রাম্পও সামরিক হস্তেক্ষেপের ঝুঁকি পুরোপুরি বাতিল করে দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরান ভেনেজুয়েলা নয়

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প অতীতে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি হত্যা, সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো পদক্ষেপ নিয়ে গর্ব করেছেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার ঘটনাও আলোচনায় আসে। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা ভিন্ন।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির কথায়, ‘এটি ভেনেজুয়েলা নয়। এখানে দ্রুত ও সহজ কোনো সমাধান নেই। বিপুল সামরিক শক্তি ছাড়া এমন পদক্ষেপ কার্যকর হবে না।’

গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরান তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া দেখালেও বিশ্লেষকদের ধারণা, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বিক্ষোভকে শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে ইরান। তাই সীমিত মার্কিন হামলাও বড় ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর বিশ্লেষক নায়সান রাফাতি বলেন, যদি ইরান মনে করে এটি বৃহত্তর অভিযানের শুরু, তাহলে তাদের মরিয়া অবস্থান বেপরোয়া সিদ্ধান্তে ঠেলে দিতে পারে।

আত্মসমর্পণ করবে না ইরান

এদিকে কূটনীতির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করলে কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব।

তবে পারসির মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের কাছ থেকে আত্মসমর্পণ চাইছে। তিনি বলেন, ‘লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ ছাড়া কূটনীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, সামরিক হোক বা কূটনৈতিক—ইরান ইস্যুতে জেতার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে সহজ কোনো পথই খোলা নেই।

সূত্র: আল-জাজিরা