ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে সেনা পাঠাতে চান ট্রাম্প, আলোচনায় খার্গ দ্বীপও
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১১:৪০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তুলে আনতে সেখানে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত চারটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ইরানে সেনা নামিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার ইচ্ছা ট্রাম্প প্রশাসন বা ইসরায়েলের নেই। খবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের।
ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে—এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটি। এ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অস্ত্রমানের পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব। মূল বিষয় হলো, এই ইউরেনিয়াম তুলে আনতে গেলে যে কোনো অভিযান চালাতে হলে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সেনাদের ইরানের মাটিতে প্রবেশ করতে হবে। তাদের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর ভেতর দিয়ে এগোতে হবে।
এখনও পরিষ্কার নয় যে এই অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল নাকি যৌথভাবে পরিচালিত হবে। তবে এমন অভিযান সম্ভবত তখনই চালানো হবে, যখন দুই দেশই নিশ্চিত হবে যে ইরানের সামরিক বাহিনী আর অভিযানে অংশ নেওয়া বাহিনীর জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারবে না।
মঙ্গলবার কংগ্রেসে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে নিরাপদ করা হবে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘মানুষকে সেখানে গিয়ে সেটি সংগ্রহ করতে হবে।’ তবে তিনি কে যাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি।
ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প ও তার দল নির্দিষ্ট কিছু মিশনের জন্য ইরানে বিশেষ অভিযান ইউনিট পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসন দুটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছে। একটি হলো পুরো ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া। অন্যটি হলো পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের সেখানে নিয়ে গিয়ে সেখানেই ইউরেনিয়ামকে পাতলা বা কম সমৃদ্ধ করা।
এই অভিযানে বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরাও থাকতে পারেন। সম্ভবত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিশেষজ্ঞরাও এতে যুক্ত হতে পারেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্পের সামনে যে সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর তালিকা উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার মধ্যেও এ ধরনের অভিযান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শুক্রবার এনবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, ট্রাম্প নির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্যে ইরানে অল্পসংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েনের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরানের ইউরেনিয়াম বের করে আনার কার্যকরী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথম প্রশ্ন হলো—এটা কোথায় আছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন—আমরা কীভাবে সেখানে পৌঁছাব এবং কীভাবে এর ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ নেব?’ তিনি আরও বলেন, ‘এরপর সিদ্ধান্ত হবে প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং সিআইএ–এর—আমরা কি এটিকে শারীরিকভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেব, নাকি সেখানেই লঘু করে দেব।’
শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে স্থলবাহিনী ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেটি হবে ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ কোনো কারণে।’ তিনি বলেন, ‘যদি আমরা কখনো সেটা করি, তাহলে (ইরানিরা) এতটাই বিধ্বস্ত হবে যে স্থল পর্যায়ে তারা আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে না।’
পারমাণবিক উপাদান নিরাপদ করতে সেনা পাঠানো হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, ‘কোনো এক সময় হয়তো আমরা করব। আমরা এখনো সেটা লক্ষ্যবস্তু করিনি। এখনই করব না। পরে হয়তো করব।’
প্রশাসনের কর্মকর্তারা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউরেনিয়ামের বের করে আনার বাইরে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য দায়ী কৌশলগত টার্মিনাল খার্গ দ্বীপে দখলের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার ফলে দেশটির ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এরপর থেকে ইরানিরাও সেটিতে পৌঁছাতে পারেনি।
ওই হামলায় ইরানের প্রায় সব সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুনরায় শুরু হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ইউরেনিয়ামের বেশিরভাগ মজুত রয়েছে ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনার ভূগর্ভস্থ টানেলে। বাকি অংশ বিভক্ত রয়েছে ফরদো ও নাতাঞ্জ পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে।
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে এমন হামলা চালায়, যা দেখে মনে হয়েছিল প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়াই লক্ষ্য। সম্ভবত ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া ঠেকানোর জন্যই এমনটি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়ামকে গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছে, কারণ এটিকে অস্ত্রমানের পর্যায়ে উন্নীত করতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ লাগবে।
পুরো মজুত যদি ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় উন্নীত করা হয়, তাহলে তা দিয়ে ১১টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো উপাদান পাওয়া যাবে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্পের কাছে বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড কথাটার মানে গণমাধ্যম যেভাবে বোঝায়, ঠিক সেভাবে নয়।’ আরেকটি সূত্র বলেছে, ‘এটা হবে ছোট আকারের বিশেষ অভিযান। বড় কোনো বাহিনী ঢোকানো নয়।’
তৃতীয় একটি সূত্রের ভাষায়, ‘যা আলোচনা হয়েছে, তা বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড হিসেবে ভাবা হয়নি। মানুষ মনে করে এটা যেন, সেকেন্ড ব্যাটল অব ফালুজার মতো বড় যুদ্ধ। আসলে আলোচনাটা সে রকম কিছু নয়।’
আমার বার্তা /জেএইচ
