বিশ্ববাজারে অস্থিরতায় ১০০ ডলার ছাড়াল জ্বালানি তেলের দাম

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল, হরমুজে শ্বাসরুদ্ধ অর্থনীতি

ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আজ সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২২ সালের জুলাই মাসের পর সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার প্রাইস ব্যারেল প্রতি ১৮.৩৫ ডলার বা ১৯.৮ শতাংশ বেড়ে ১১১.০৪ ডলারে পৌঁছায়। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১৬.৫০ ডলার বা ১৮.২ শতাংশ বেড়ে ১০৭.৪০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যেখানে সপ্তাহেও ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই-এর দাম যথাক্রমে ২৭ শতাংশ এবং ৩৫.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরাক ও কুয়েত তেল উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে। কাতার ইতিমধ্যেই তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ইরাকের রাষ্ট্রায়ত্ত বসরা অয়েল কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের তেলের মজুদাগারগুলো পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে বাধ্য হয়েই তারা উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ১.৩ মিলিয়ন ব্যারেলে নামিয়ে এনেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্টোরেজ সুবিধা না থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবও দ্রুত উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। বহুজাতিক আর্থিক সেবা সংস্থা এএনজে-এর সিনিয়র কমোডিটি স্ট্র্যাটেজিস্ট ড্যানিয়েল হাইনস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে কেবল সরবরাহ কমে যাওয়া নয়, যুদ্ধ থামার পরও পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ফলে তেলের চড়া দাম অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে।’

এই সংকটের মধ্যেই ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মোজতবার এই নিয়োগ তেহরানের কট্টরপন্থী অবস্থানকে আরও শক্ত করবে। রাকুটেন সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক সাতোরু ইয়োশিদা জানান, খামেনির উত্তরাধিকারী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের ‘শাসন পরিবর্তন’ লক্ষ্য আরও কঠিন হয়ে পড়ল। এর ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা এবং তেল স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকতে পারে, যা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১২০ থেকে ১৩০ ডলারে নিয়ে যেতে পারে।

ইরানের যুদ্ধ সপ্তম দিনে পদার্পণ করায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শিল্প এলাকায় ধ্বংসাবশেষ পড়ে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের শায়বাহ তেলক্ষেত্রের দিকে ধেয়ে আসা একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে মার্কিন রাজনীতিতেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। সিনেট ডেমোক্রেটিক লিডার চাক শুমার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ (এসপিআর) থেকে তেল ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমেরিকান পরিবারগুলো যে প্রাইস শক বা মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কার মুখে, তা সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত এখনই এসপিআর থেকে তেল বাজারে ছাড়া।’

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ এখন খাদের কিনারায়। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং লজিস্টিক জটিলতার কারণে বিশ্বজুড়ে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চমূল্যের ধকল সইতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


আমার বার্তা/এমই