ফিফা কোনো স্বাধীন সংস্থা নয়, রাজনৈতিক হাতিয়ার: ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) আর কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশন নয়, বরং এটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট ও তার মিত্রদের পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ রক্ষাকারী একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জাভিয়ের আবু ঈদ। ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের এই পিএইচডি গবেষক ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সাবেক উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ফুটবল থেকে রাজনীতিকে দূরে রাখার যে মূল দায়িত্ব ফিফার ছিল, তা থেকে সংস্থাটি সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়েছে।

নিচে আল-জাজিরায় প্রকাশিত আবু ঈদের মতামতের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

চলতি বিশ্বকাপ ও ফিফার বিতর্কিত ভূমিকা

চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ ফিফা ও তার বর্তমান নেতৃত্বকে বিশ্বজুড়ে তীব্র যাচাই-বাছাই ও নজিরবিহীন সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পর একজন মার্কিন ফুটবল খেলোয়াড়ের ওপর আরোপিত সাময়িক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত ফিফা নিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে সাধারণ ফুটবল ভক্তদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। এর পাশাপাশি, চলতি টুর্নামেন্টে মিশর ও কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন দায়িত্বরত রেফারিরা অন্যায় ও রহস্যজনকভাবে মাঠের সিদ্ধান্তগুলোতে আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিয়েছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা ক্রীড়াপ্রেমিদের মধ্যে তীব্র সন্দেহের উদ্রেক করেছে।

ফিলিস্তিনি ফুটবলে ফিফার দ্বিমুখী নীতি ও দুর্নীতি

জাভিয়ের আবু ঈদ উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনের মানুষ দীর্ঘ বছর ধরে ফিফার এই চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, পক্ষপাতমূলক ও অনৈতিক চরিত্রটি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে আসছে। ফিফার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংবিধানে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকে কঠোরভাবে সম্মান জানানোর বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও, ফিলিস্তিনি ফুটবলের ক্ষেত্রে সংস্থাটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

অবৈধ বসতিতে বসবাসকারী ইসরায়েলি ক্লাব ও দলগুলোকে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে অধিকৃত ও চুরি করা ফিলিস্তিনি জমিতে তাদের নিয়মিত লিগ ম্যাচ খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (আইএফএ) অবিলম্বে বরখাস্ত করার জন্য ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) বিগত বছরগুলোতে বারবার আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু ফিফা প্রতিবারই ফিলিস্তিনের সেই অত্যন্ত ন্যায়সংগত ও আইনগত দাবিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েলি অপরাধে ফিফার নীরবতা ও সংহতি

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক আগ্রাসনে ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড এবং তাদের পঙ্গু করে দেওয়ার বর্বর ঘটনাকে ফিফা কখনো ন্যূনতম নিন্দা পর্যন্ত জানায়নি। অতি সম্প্রতি ফিলিস্তিনি নারী জাতীয় ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য র্যান্ড হালাওয়ানি এবং নাটালি আবু দায়েহসহ অন্যান্য আটককৃত ও কারাবন্দী ফুটবলারদের মুক্তির জন্যও আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনো প্রকার দাবি তোলেনি এই ক্রীড়া সংস্থাটি।

ইসরায়েলি বিমান হামলায় ফিলিস্তিনি ফুটবল স্টেডিয়ামগুলো একের পর এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও ফিফা তার বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করেনি। এমনকি ফিলিস্তিনি জাতীয় ও স্থানীয় দলগুলোর আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে ইসরায়েল যে অন্যায় পারমিট বা ট্রাভেল ভিসা প্রত্যাখ্যানের নীতি বজায় রেখেছে, তা বন্ধ করতেও ফিফা কোনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করেনি। অন্যদিকে, ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ) কেবল বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য ও অবৈধ দখলদারিত্বকে প্রশ্রয় ও স্বাভাবিকীকরণই করেনি, বরং গাজা বা লেবাননে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধে সরাসরি অংশ নেওয়া ইসরায়েলি ফুটবলারদের অভিনন্দন জানানোর অনৈতিক প্রক্রিয়াতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজোলিউশনের বারবার দেওয়া স্পষ্ট রুলিং ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও, ফিফা এখনো ইসরায়েলের পক্ষে সাফাই গেয়ে আসছে। সংস্থাটির বলছে, ফিলিস্তিনের এই দাবিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অত্যন্ত জটিল বিষয় ও পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি মর্যাদা এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। এটি মূলত সরাসরি ইসরায়েলি মিথ্যা প্রচারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়ার শামিল, যা ট্রাম্প প্রশাসন তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক শাস্তি থেকে রক্ষা করতে ও ফিলিস্তিনি জমি চুরির প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে গ্রহণ করেছিল।

যেভাবে ইসরায়েল তার অবৈধ সংযুক্তিকে বিশ্ববাসীর কাছে বৈধ করতে পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম এবং কৃষিকে প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করেছে, ঠিক একইভাবে তারা ফিফার প্রত্যক্ষ সমর্থনে ফুটবলের মাধ্যমেও এই স্বাভাবিকীকরণের নোংরা খেলা খেলছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইনফান্তিনো

ঈদ বলছেন, ফিফার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কার্যকালেই ইসরায়েলি অপরাধের প্রতি ফিফার এই অনৈতিক ও অন্ধ সমর্থন আরও প্রকট ও সম্প্রসারিত হয়েছে। এই কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এরই মধ্যে ইনফান্তিনোর এই সব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নথিপত্র সরাসরি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠিয়েছে। সেখানে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তিনি এই সব প্রথা যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য ও সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের শামিল, তা পূর্ণরূপে জানা সত্ত্বেও এ বিষয়ক একাধিক প্রতিবেদন ও চিঠিপত্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গেছেন।

ফিফা নেতৃত্ব কেবল ইসরায়েলের অপরাধ ও আইএফএ’র সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে নীরব ও নিষ্ক্রিয়ই থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা ধামাচাপা দিতে বা হোয়াইটওয়াশ করতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। গত মাসেও ফিফা শান্তি প্রচারের নামে একটি অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ফিলিস্তিনকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে খেলার কুৎসিত প্রস্তাব দেয়। তার কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবে পিএফএ’র প্রধানকে আন্তর্জাতিক ক্যামেরার সামনে তার ইসরায়েলি সমকক্ষের সঙ্গে জোরপূর্বক হাত মেলাতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক এজেন্ডা ও বিশ্বস্ততা

জাভিয়ের আবু ঈদের মতে, জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেই এই ক্রীড়া সংস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তরের এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। ২০১৮ সালে কোনো যৌক্তিক ও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই তিনি ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজে আয়োজিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন, যে রাজনৈতিক চুক্তিটি মূলত সামগ্রিক আরব এজেন্ডা থেকে ফিলিস্তিন সংকটকে চিরতরে মুছে ফেলার একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ছিল।

২০২১ সালে তিনি জেরুজালেমের মুসলিমদের পবিত্র ও ঐতিহাসিক মামিল্লাহ কবরস্থানকে অপবিত্র ও গুঁড়িয়ে দিয়ে নির্মিত একটি ভেন্যুতে ডানপন্থি ইসরায়েলি সংবাদপত্র ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক সম্মেলনে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইনফান্তিনো উগ্রপন্থি ও বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে জাতিসংঘের চিরস্থায়ী সম্পৃক্ততা বন্ধ করা ও ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান গণহত্যা অবসানের যে কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করা। এমনকি, তিনি এই বিতর্কিত বোর্ডের সঙ্গে ‘ফুটবলের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছেন।

আস্থার সংকট ও ফিলিস্তিনি ফুটবলের ভবিষ্যৎ

চলমান বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষকে এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা উচিত। আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট ফুটবলার, রেফারি ও সাধারণ ভক্তদের বিরুদ্ধে যে বিভিন্ন প্রকার দৃশ্যমান মানবাধিকার ও নিয়ম লঙ্ঘন করেছে, সে সম্পর্কে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে ইনফান্তিনো কোনো সদুত্তর না দিয়ে উল্টো বিশ্ববাসীকে কেবল ‘চিল, রিল্যাক্স’ বা শান্ত থাকার অসংবেদনশীল পরামর্শ দিয়েছেন।

ঈদের মতে এই সব রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ড ফিফার মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ওপর বিশ্বজনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে চিরতরে ধূলিসাৎ করছে ও ফুটবলের সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। ইনফান্তিনো যদি অবিলম্বে তার এই অনৈতিক পথ আমূল পরিবর্তন না করেন, তবে তিনি ফুটবলের ইতিহাসে কেবল একটি ধ্বংসাত্মক ও কলঙ্কিত উত্তরাধিকার রেখে যাবেন। তবে ফিলিস্তিনি ফুটবল তার নিজের শক্তিতেই টিকে থাকবে, যা ১৯০৪ সালে জেরুজালেমের সেন্ট জর্জ স্কুল টিম গঠনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল। - সূত্র: আল-জাজিরা