বড় বোনের হয়ে কারাগারে গিয়ে ধরা, আদালতে ফাঁস ‘আয়নাবাজি’ কাণ্ড
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১৮:২০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

পর্দার ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার গল্প আরেকবার দেখা গেল বাস্তবেই। প্রতারণার মামলায় বড় বোনের পরিবর্তে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে গেছে এক নারী। অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর চেহারার অমিল ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসে ‘প্রক্সি’ আত্মসমর্পণের ঘটনা। পরে আত্মসমর্পণ করা নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৮ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন রিমান্ডের আদেশ দেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ডের তথ্য নিশ্চিত করেন। অভিযুক্ত এই তরুণীর নাম ভাবনা বলে শুনানিতে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
গত মঙ্গলবার (১২ মে) বড় বোন শারমিন আক্তার একার পক্ষে ছোট বোন আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান। তবে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রিমান্ড শুনানির সময় বাদীপক্ষ দাবি করে, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী প্রকৃত আসামি নন। পরে আদালত তাকে মুখ দেখাতে বললে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়নি। এরপর ওই নারী প্রকৃতপক্ষে শারমিন আক্তার একা কিনা, তা যাচাই করে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহবুবুল আলম গত ১৫ মে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আবেদনে তিনি বলেন, শারমিন আক্তার একা পরিচয়ে আইনজীবী রাজু আহমেদ রাজিবের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করা হয়। আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আসামির পরিচয় যাচাই করতে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এ জন্য তাকে রিমান্ডে নেওয়া দরকার।
আজ সোমবার রিমান্ড শুনানির সময় আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন রিমান্ড বাতিল করে জামিন চান। তিনি আদালতে বলেন, ‘কাঠগড়ায় উপস্থিত তরুণী শারমিন আক্তার একা নন, ভাবনা। তিনি মামলার আসামি নন। বোনের হয়ে প্রক্সি দিয়েছেন, তা প্রমাণ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা হবে। যেহেতু ভুল স্বীকার করা হয়েছে, তার অব্যাহতি চাই।’
অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী রকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তারা বলেন, প্রতারণার সঙ্গে ওই নারী জড়িত থাকায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
জানা গেছে, প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে এবং ‘কুফরি-কালাম’ ও ‘শয়তানের নিঃশ্বাসের’ মাধ্যমে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই মামলাটি দায়ের করা হয়। এতে আরও অভিযোগ করা হয়, ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী আজিজুল আলম উত্তরা পূর্ব থানায় শারমিন আক্তার একাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ বিভিন্ন সময়ে শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষার নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন।
মামলার এজাহারে আজিজুল আলম অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান নামে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানান, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আনা হবে, যার অর্ধেক তিনি পাবেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, সোহেলের ‘সুন্নতি লেবাস’ ও কথাবার্তায় তিনি আস্থা পান। পরে বিভিন্ন ‘কুফরি কালাম’ ও ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ব্যবহার করে তাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এরপর টাকা, স্বর্ণালংকার ও জমিজমা হাতিয়ে নেওয়া শুরু হয়।
বিভিন্ন সময়ে আজিজুল আলমকে নানা খাবার ও মিষ্টি খাওয়ানো হতো। এরপর থেকে তার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি কাজ করত না এবং তিনি তাদের কথামতো চলতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘জ্বিনের মা’ পরিচয়ে এক নারী বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করতেন। পরে নাজমুল, সোহেল ও অন্যরা বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে টাকা নিতে থাকেন। একপর্যায়ে ‘জ্বিনের বাদশা’ পরিচয়ে রাসেল নামে একজন ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে ক্ষতির হুমকি দেন।
বাদীর অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরখান এলাকায় তার ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও লিখে নেওয়া হয়েছে।
মামলার চার আসামি শারমিন আক্তার একা, লাইলী শাহনাজ খুশি, এ আর রাসেল ও আব্বাসের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন রাজু আহম্মেদ রাজিব। ঘটনার পর তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে রোববার আদালতে মামলা থেকে অব্যাহতি চান। আদালত তার আবেদন নথিভুক্ত করেছেন। তবে সোমবারের শুনানিতে আদালত মন্তব্য করেন, ওই আইনজীবীর লাইসেন্স বাতিল করা দরকার।
আমার বার্তা/এমই
