বাজেট দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে: মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৬, ১৬:১১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে প্রাক্কলনগুলো করা হলে বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা অনেক বেশি সুদৃঢ় হতো।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ সিপিডির গবেষক ও কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্য ও অঙ্গীকারের সঙ্গে একমত হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বড় ম্যান্ডেট ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাজেটে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বাজেটে আমদানি প্রতিস্থাপক ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক, এইচডি ও এআইটির মতো কর বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন শুল্ক হার কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক যানবাহন, সোলার প্যানেলসহ পরিবেশবান্ধব খাতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েই মূল প্রশ্ন রয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের প্রথম ঝুঁকি হচ্ছে সরকারের প্রাক্কলনের ভিত্তি। সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রপ্তানি-আমদানি কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধি— সব ক্ষেত্রেই যে ভিত্তির ওপর হিসাব দাঁড় করানো হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তার ভাষায়, এখানেই বাজেটের একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের শৃঙ্খলা প্রয়োজন, সেখানে ভিত্তিটাই দুর্বল।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় এক দশমিক ৮ শতাংশ নেতিবাচক অবস্থানে থাকলেও বাজেটে বছর শেষে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। আবার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি থাকলেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া সম্পদ আহরণে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটের প্রাক্কলন এমন ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতিতে হঠাৎ বড় ধরনের গতি ফিরে আসবে। রপ্তানি, আমদানি, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতিসহ প্রায় সব সূচকে আকস্মিক উন্নতি হবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাক্কলনগুলো আরও বাস্তবসম্মত হলে বাজেটের শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হতো। কারণ সেপ্টেম্বর নাগাদ যখন বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাবে, তখন বর্তমান প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার বড় পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
সিপিডির এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য বাস্তবসম্মত ভিত্তি নির্ধারণ করা আরও সহজ ছিল। কারণ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সরকার আগের সময়ের নানান প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার উত্তরাধিকার পেয়েছে। তাই সেসব বাস্তবতা স্বীকার করে আরও বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপর বাজেট প্রণয়ন করলে তা অধিক গ্রহণযোগ্য হতো।
তিনি বলেন, সরকারের জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ও উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে দ্বিমত নেই। তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বণ্টন, সম্পদের বরাদ্দ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজেটের অনেক পদক্ষেপের সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ নেই। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে না পারলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ চাঙ্গা করার জন্য বাজেটে বিভিন্ন প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার ওপর।
