রক্ত, আগুন ও ইন্টারনেট অন্ধকারে বদলে যাওয়া এক দিন

১৮ জুলাই ২০২৪

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

রক্ত, আগুন আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে থমকে গিয়েছিল বাংলাদেশ

আজ ১৮ জুলাই। ২০২৬ সালের এই দিনে পূর্ণ হলো ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তক্ষয়ী দিনটির দুই বছর। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা। দিনের শেষ ভাগে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিলে কার্যত বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। আন্দোলনের ইতিহাসে ১৮ জুলাই পরিণত হয় এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া দিনে।

১৭ জুলাই রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরদিন সকাল থেকেই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ সফল করতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্র ছিল উত্তরা। সকাল ১১টার পর থেকেই সড়ক অবরোধকে ঘিরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। আন্দোলনকারীরাও ইট-পাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

উত্তরার সংঘর্ষে পুলিশের একটি গাড়ি আন্দোলনকারীদের চাপা দেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এতে বহু মানুষ আহত হন। আহতদের উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সন্ধ্যার মধ্যেই শুধু উত্তরা এলাকা থেকে আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আন্দোলনকারীদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। পরে তার মৃত্যু আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। 

রাজধানীর মহাখালী, বনানী, মিরপুর, ধানমন্ডি, রামপুরা, বাড্ডা, প্রগতি সরণি ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায়ও সারাদিন সংঘর্ষ চলতে থাকে। মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানী সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। একটি বাসে আগুন লাগার ধোঁয়া মেট্রোরেলের লাইনে ছড়িয়ে পড়লে পরে চারটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

ধানমন্ডির ২৭ নম্বর এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ। একই দিনে যাত্রাবাড়ীতে দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান।

রাজধানীর প্রগতি সরণি এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্টসহ একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যত ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনে নতুন গতি আনেন। রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় পুলিশি অভিযানের মুখেও তারা আহতদের উদ্ধার ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকাতেও সংঘর্ষে হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

দিনভর সংঘর্ষের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকটি এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনার ভিডিও ও ছবি পরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সারাদেশেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বারুদের মতো। নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সাভার, মাদারীপুর, রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছিল, ওই দিন সাংবাদিকসহ অন্তত ৩১ জন নিহত হন। অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা অন্তত ২৭ জন বলে উল্লেখ করা হয়। আহত হন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। সংঘর্ষের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায়।

সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজধানীর রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে সম্প্রচার ব্যাহত হয় এবং ভবনের ভেতরে আটকে পড়েন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

একই দিনে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে দেশের অধিকাংশ জেলার রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। রাত ৯টার পর সরকার দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। এর আগে ১৭ জুলাই রাত থেকেই মোবাইল ইন্টারনেট কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনলাইন যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ আদান-প্রদান এবং জরুরি ডিজিটাল সেবা প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে পাঁচ দিন ব্রডব্যান্ড এবং আট দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হিসেবে আলোচিত হয়।

ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর প্রথমদিকে মহাখালীর খাজা টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও পরে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) জানায়, ওই অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধের সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। সংগঠনটির দাবি ছিল, সরকারি নির্দেশনার ভিত্তিতেই ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধান্তে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেদিনই কোটা সংস্কারের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হওয়ার কথা জানায় সরকার। জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সরকারের আগ্রহের কথা জানান। একই সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, সরকারি চাকরিতে ৮০ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ কোটার আওতায় রাখার সুপারিশ করবে সরকার।

তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সরকারের আলোচনার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘গুলি আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’

আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে জানান, শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না।

অন্যদিকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন প্রধান হারুন অর রশীদ যাত্রাবাড়ী পরিদর্শনে গিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি দাবি করেন, সহিংসতায় জড়িতরা কোটা আন্দোলনের অংশ নয় বরং জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মী। একই সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলতে থাকে। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসও নিজ দেশের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা জারি করে।

১৮ জুলাই রাতভর সংঘর্ষের পর ১৯ জুলাই ভোরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। ঢাকাসহ সারাদেশে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও প্রাণহানির খবর আসতে থাকে।

তবে ১৮ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু ওই দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যু আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে তাদের স্মরণে নতুন করে সংগঠিত হয় আন্দোলনকারীরা।

এছাড়া পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার টেলিযোগাযোগ খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়। এতে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধের ক্ষমতা সীমিত করা, বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং নাগরিকদের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা আরোপের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।