পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি নয়, ক্লাসরুমে চাই শিক্ষকের আন্তরিকতা
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৯:০৩ | অনলাইন সংস্করণ
শাহ্ মহিউদ্দীন:

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে চারদিকে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যেকোনো জাতির অগ্রগতির প্রধান শর্ত। তবে প্রায়ই দেখা যায়, শিক্ষার মান বাড়ানোর সহজ উপায় হিসেবে শুধু পরীক্ষার খণ্ডকালীন কড়াকড়ির ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো বা পরীক্ষার হলে কঠোর গার্ড দিলেই কি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হয়? উত্তর হচ্ছে, না। শুধু পরীক্ষার খাতা বা হলের ওপর জোর দিয়ে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চেপে ধরলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
শিক্ষার প্রকৃত রূপান্তর, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। নিচে বিষয়টিকে পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করা হলো:
ভয়ের সংস্কৃতি বনাম মেধার বিকাশ: পড়াশোনাকে যখন আনন্দের বদলে একটি ভীতি বা নিছক দেওয়াল পার হওয়ার যুদ্ধ বানিয়ে ফেলা হয়, তখন শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক মেধার বিকাশ থমকে যায়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা কিশোর মনে মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। ভয় থেকে জন্ম নেয় ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে যেকোনো উপায়ে পরীক্ষায় পাসের শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে বাধ্য হয়।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের আন্তরিকতা: শিক্ষার প্রকৃত মানোন্নয়ন করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের আরও বেশি আন্তরিক হওয়া। শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতা মুখস্থ করানোর যন্ত্র নন, তিনি হবেন একজন মেন্টর ও পথপ্রদর্শক। একজন আন্তরিক শিক্ষক ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীকেও ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে শিখনে আগ্রহী করে তুলতে পারেন। ভয়ের সংস্কৃতির বদলে যদি ক্লাসরুমে সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি হয়, তবে শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই জানার কৌতূহল প্রকাশ করবে।
স্কুল বর্জন ও কোচিং বাণিজ্যের আগ্রাসন: অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ অনেক শিক্ষকের আন্তরিকতা শ্রেণিকক্ষ ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে গিয়ে ঠেকেছে। স্কুলের নিয়মিত ক্লাসে অনেক শিক্ষকই এখন আর মনোযোগ দিয়ে পড়াতে চান না, বরং শিক্ষার্থীদের নিজের কাছে প্রাইভেট বা কোচিং সেন্টারে পড়তে উৎসাহ প্রদান করেন। ফলে ক্লাসরুমগুলো প্রাণহীন হয়ে পড়ছে এবং দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপছে। শিক্ষকদের এই অনীহা এবং বাণিজ্যিক মানসিকতা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অনৈতিক চর্চা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য: শিক্ষা কেবল একমুখী কোনো প্রক্রিয়া নয়; এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার একটি পবিত্র মেলবন্ধন। শিক্ষকদের কাছ থেকে আন্তরিকতা পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ থাকা অপরিহার্য। ক্লাসরুমে শিক্ষকের পাঠদান মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁর আদেশ-উপদেশ মেনে চলা এবং নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখা একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর প্রধান কর্তব্য। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন আচরণ থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত থাকতে হবে। শ্রদ্ধা ও স্নেহের এই পারস্পরিক বন্ধনই কেবল একটি সুস্থ শিক্ষাবাতাবরণ তৈরি করতে পারে।
যুগোপযোগী ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে আমাদের প্রয়োজন একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। শুধু গতানুগতিক ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা না করিয়ে শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার (Critical Thinking) দক্ষতা শেখাতে হবে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পাঠ্যক্রমকে প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন করা এবং কর্মমুখী শিক্ষার পরিধি বাড়ানো আজ সময়ের দাবি।
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা: শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সাথে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য ও নিষ্ঠাবানদের শিক্ষকতা পেশায় ধরে রাখতে যেমন সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্ব অবহেলাকারী ও বাণিজ্যিক মানসিকতার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। পরীক্ষার শাসন কমিয়ে আমাদের জোর দিতে হবে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশের ওপর। কোচিং বাণিজ্যের অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করে ক্লাসরুমকে আবার শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে। শাসন নয়, বরং পরম স্নেহ, গভীর আন্তরিকতা এবং সময়োপযোগী পাঠদানের মাধ্যমেই কেবল শিক্ষার্থীদের সুস্থ এবং মানবিক মেধার বিকাশ সম্ভব। রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সত্যটি যত দ্রুত বাস্তব রূপ পাবে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ তত দ্রুত উজ্জ্বল হবে।
লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
আমার বার্তা/শাহ্ মহিউদ্দীন/এমই
