তাওহীদ হৃদয়ের ৩৫০: সংকটের বাংলাদেশে সাহসের নতুন গল্প
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

কখনো কখনো একটি ব্যাটই একটি দেশের মন ভালো করে দিতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে তাওহীদ হৃদয় যখন ৩৫০ রানে অপরাজিত থেকে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরির ইতিহাস লিখলেন, তখন মনে হলো—এই ছেলেটি শুধু রান করেনি, একটু সাহসও করে দিয়েছে দেশবাসীকে। ৪৮২ বলের সেই দীর্ঘ ইনিংসটি যেন ধৈর্যের এক চমৎকার পাঠ: শুরুতে বিপদ, মাঝখানে প্রতিরোধ, শেষে ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসও এখন তাঁর। সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালও নিজের রেকর্ড ভাঙায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
হৃদয়ের এই সাড়ে তিনশ রানটি তাই নিছক ক্রিকেটের খবর নয়; এটি এই মুহূর্তের বাংলাদেশের জন্য একটি রূপকও বটে। চারদিকে যখন বিদ্যুৎ-গ্যাসের টান, শিল্পে উৎপাদনের উদ্বেগ, ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, তখনও একটি প্রজন্ম দেখিয়ে দিচ্ছে—সুযোগ পেলে বাংলাদেশ পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না, গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে; কিন্তু সংকটের অর্থ এই নয় যে সম্ভাবনাও শেষ। বরং এখন প্রয়োজন জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং অপচয় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সংকটকে যদি দক্ষতার পরীক্ষায় পরিণত করা যায়, অন্ধকারও একদিন বিদ্যুতের বিলের মতো হিসাবযোগ্য হয়ে যাবে।
অর্থনীতির ছবিটিও একই কথা বলে। খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়; কিন্তু এর চিকিৎসা আছে—ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার, প্রকৃত ব্যবসায়ীকে অর্থায়ন এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা। সরকারের নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তার অভিঘাত বাজারে মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতের মজুরি কাঠামোয় পড়তে পারে—তাই বেতন বাড়ানোর সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনারও সমান্তরাল উদ্যোগ দরকার। মানুষের আয় বাড়বে, কিন্তু সেই বাড়তি আয় যদি বাজারের দোকানদারের কাছে গিয়ে থেমে যায়, তবে অর্থনীতির আনন্দটি কাগজেই থেকে যাবে।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সংগঠিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রতিদিন হাসপাতালে নতুন রোগী আসছে; আবার রাস্তায় নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নামছে। দুটো ঘটনাই আমাদের একই শিক্ষা দেয়—প্রতিরোধের ব্যবস্থা দুর্বল হলে পরে তার মূল্য অনেক বেশি দিতে হয়। ডেঙ্গুতে মশা মারার চেয়ে মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা যেমন জরুরি, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার পরে ক্ষোভ প্রকাশের চেয়ে দুর্ঘটনার কারণ বন্ধ করাই রাষ্ট্রের আসল দায়িত্ব। নিরাপদ সড়ক কোনো ছাত্র-দাবি নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
এই জায়গাতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। প্রথম আলো-র সম্পাদকীয় যথার্থভাবেই মনে করিয়ে দিয়েছে—সাংবাদিকের ওপর বাধা, হামলা, হুমকি কিংবা পেশাগত কাজে প্রতিবন্ধকতা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। নতুন সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক পরিবেশকে পুরোনো অভ্যাস থেকে আলাদা করতে চায়, তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার অন্যতম পরীক্ষাক্ষেত্র। সমালোচনার কণ্ঠ বন্ধ করলে সরকার নিজের ভুলের আয়নাটিই ভেঙে ফেলে। আর আয়না ভাঙার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো—মুখে কালি লেগেছে কি না, তখন আর বোঝা যায় না।
গ্যাস সংকটের ক্ষেত্রেও এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়ন জরুরি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি যেন আরেকটি সরকারি আশ্বাস হয়ে না থাকে। শিল্পের চাকা, বিদ্যুতের টারবাইন, রান্নাঘরের চুলা—সবই একই গ্যাসের গল্প বলে। তাই সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি কোথায় অপচয়, কোথায় অব্যবস্থাপনা, কোথায় অবৈধ সংযোগ কিংবা অদক্ষতা—সেগুলোরও হিসাব নিতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সবচেয়ে বড় দাবি সবসময় নতুন প্রতিশ্রুতি নয়; পুরোনো প্রতিশ্রুতির হিসাব।
আর পৃথিবীও আজ খুব শান্ত সংসার নয়। পেরু ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তাদের অভিযোগ—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক চলাচলে বাধা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। হরমুজের উত্তাপ তাই ঢাকার বাজারেও পৌঁছাতে পারে—জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প, খাদ্য—সব কিছুর ওপর তার ঢেউ লাগে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা একটাই: বৈশ্বিক সংকটের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু সংকটের অভিঘাত সামলানোর প্রস্তুতির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণ, জ্বালানি মজুত, সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা এখন বিলাসিতা নয়—জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
শেষ পর্যন্ত তাই আজকের বাংলাদেশের গল্পটি হতাশার নয়, প্রস্তুতির। তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাট আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রথম চার উইকেট পড়ে গেলেও ইনিংস শেষ হয়ে যায় না। দরকার একজন হৃদয়, কয়েকজন জাকের, আর একটি দল যারা শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থাকে। রাষ্ট্রও তেমনই; সমস্যা থাকবে, ভুল থাকবে, আন্তর্জাতিক চাপ থাকবে, বাজারের দুশ্চিন্তা থাকবে। কিন্তু সৎ প্রশাসন, মুক্ত গণমাধ্যম, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের ওপর আস্থা থাকলে সংকটই একদিন সক্ষমতার পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রয়োজন এখন অভিযোগের চেয়ে কর্মপরিকল্পনা, আতঙ্কের চেয়ে প্রস্তুতি এবং হতাশার চেয়ে একটু বেশি সাহস—ঠিক তাওহীদ হৃদয়ের ৩৫০ রানের মতো।
