আমাদের শিশুরা কতটা নিরাপদ
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:০৯ | অনলাইন সংস্করণ
জামিল হোসেন

শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের হাসি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের চিত্র। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে_আমাদের শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ শিশুর নিরাপত্তা শুধু ঘর কিংবা বিদ্যালয়ের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি, সামাজিক পরিবেশ, সড়কব্যবস্থা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ।
একসময় শিশুর নিরাপত্তা বলতে মূলত ঘরের বাইরে বিপদ থেকে তাদের রক্ষা করার বিষয়টি বোঝানো হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেক জটিল। একটি শিশু শারীরিকভাবে নিরাপদ একটি ঘরে বসেও অনলাইনে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, সাইবার বুলিং কিংবা অনুপযুক্ত কনটেন্ট। এসব বিষয় শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা যেমন শিশুদের শেখার সুযোগ বাড়িয়েছে, তেমনি নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সন্তান নিয়ে মা-বাবা এমনতিই উদ্বিগ্ন থাকেন। কোনো অঘটনের খবরে সে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। রাজধানীর অভিভাবকদের চাপ সম্ভবত আরেকটু বেশি। প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশু সন্তানকে স্কুলে দিয়ে আসা। ছুটির পর নিয়ে আসতে কিছুটা দেরি হলে চিন্তায় পড়ে যাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও স্বস্তি পাই না। সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে যেমন অভিভাবকের চিন্তা থাকে, তেমনি তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিকাশ নিয়েও উদ্বেগ কম নয়।
অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে অভিভাবকেরা সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে পারেন না। অথচ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ হলো তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। কোনো শিশু যদি ভয়, অস্বস্তি বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানায়, তাহলে তাকে অবিশ্বাস বা দোষারোপ না করে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হলে সে বিপদের কথা সহজে জানাতে পারে।
বিদ্যালয়ও শিশুর নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বিদ্যালয়ে শুধু ভালো ফলাফল নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেখানে শিশুর জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষক, কর্মচারী এবং সহপাঠীদের আচরণও শিশুর মানসিক নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বুলিং, শারীরিক শাস্তি, অপমানজনক আচরণ কিংবা বৈষম্য কোনোভাবেই শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ হতে পারে না। একটি শিশুকে নিরাপদ মনে করাতে হলে তাকে মর্যাদা দিতে হবে এবং তার অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তাও আমাদের শিশুদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রতিদিন অনেক শিশু স্কুলে যাতায়াত করে। অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, ফুটপাতের অভাব, রাস্তা পারাপারের ঝুঁকি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা তাদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। শুধু শিশুদের রাস্তা পারাপারের নিয়ম শেখালেই হবে না; চালক, পথচারী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুর মানসিক নিরাপত্তা। আমরা অনেক সময় শিশুর শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর দিলেও তার ভয়, উদ্বেগ, একাকিত্ব বা আত্মবিশ্বাসের সংকটকে গুরুত্ব দিই না। পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক তুলনা কিংবা অনলাইন জগতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা শিশুর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিশুর ভালো ফলাফলের পাশাপাশি তার মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধেও সমাজের প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো শিশুর প্রতি নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনা দেখেও যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে সেই নীরবতা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবেশী, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন কিংবা সমাজের অন্য সদস্যদের উচিত শিশুর প্রতি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ চোখে পড়লে দায়িত্বশীলভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।
তবে শুধু পরিবার বা বিদ্যালয়ের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রকে শিশুবান্ধব আইন ও সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ, নিরাপদ গণপরিবহন, মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার সুযোগ তৈরি করা দরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও শিশু ও অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, “আমাদের শিশুরা কতটা নিরাপদ?”—এটি শুধু একটি প্রশ্ন নয়, বরং আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি পরীক্ষা। শিশুকে নিরাপদ রাখতে হলে তাকে ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতনতা, ভালোবাসা, সম্মান ও সুরক্ষার মাধ্যমে বড় করতে হবে। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত, যখন সেখানে শিশুরা নিশ্চিন্তে খেলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, ভুল করতে পারে এবং নিজের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তাদের অধিকার নয়; এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।
লেখক : জামিল হোসেন, অনলাইন নিউজ এডিটর, দৈনিক আমার বার্তা, ঢাকা।
