দুর্নীতির বিচার ও পাচারকৃত অর্থ ফেরতের চিন্তা

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  মাহমুদুল হক আনসারী

দুর্নীতি নামক শব্দটির অর্থ আমরা কম বেশি সকলেই অবগত। দুর্নীতি অর্থ অর্থপাচার। কালো টাকার মালিক। দেশের টাকা বাহিরে পাচার করা। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে  পঙ্গু করে দেয়া। সরকারের ক্ষমতায়  থেকে জনগণের অধিকার খর্ব করে জাতীয় অর্থ পকেটস্থ করাকে দুর্নীতি হিসেবে জনগণ বুঁঝে। 

এই দুর্নীতি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের শুরু থেকে। এখনো পর্যন্ত চলমান রয়েছে। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ এবং জনগন মেরুদন্ড সোজা  করতে পারছে না। যারাই সরকারে যায়, তারাই সরকারে থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে লাখ লাখ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাধ করে। ফলে দেশের টাকা, জনগণের টাকা লুটপাট হয়। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান টাকা দেশে গোপন করতে না পেরে বিদেশে পাচার করে দেয়। স্বাধিনতার পর পঞ্চান্ন বছরের হিসেবে লাখ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে দুর্নীতিবাজরা পাচার করেছে। কোনোভাবেই তাদের কারণে দেশের অর্থনীতি দাঁড়াতে পারছে না। এই জন্য দুর্নীতিবাজ অপরাধীরা দায়ি। 

উন্নয়নের নামে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। উন্নয়ন রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য বিষয়। একটি সমাজ তার অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়ন অপরিহার্য বিষয়। উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ছাড়া সমাজ, রাষ্ট্র অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। পরিবার থেকে সমাজ রাষ্ট্র সব জায়গায় ধারাবাহিক ভাবে উন্নয়ন কর্মসূচি থাকতে হয়। রাষ্ট্রের পরিচালকদের দায়িত্ব হলো দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন কর্মসূচি সঠিকপন্থায় বাস্তবায়ন করা। 

সরকারের প্রশাসনিক স্থর রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি বিস্তৃত। লাখ লাখ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি নির্ধারিত বেতন ভুক্ত কর্মকর্তা কর্মচারি হিসেবে নিয়োজিত আছে। তারা জনগনের টেক্সের টাকায় বেতন ভুগি কর্মচারি। মাস শেষে বেতন ভাতা পেয়ে থাকে। পেনশন , উৎসব ভাতা সহ রাষ্ট্রিয় নানা সুবিধে ভোগ করে। স্বাধিনতার পঞ্চান্ন বছরে এই দেশে হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারি তৈরি হয়েছে। চাকরি পেয়েছে। আবার চাকরির শেষে অবসরে গেছে। তাদের পরিবার-পরিজন, পোষ্য, আত্নিয়স্বজন নানা ভাবে রাষ্ট্র থেকে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। আবার সেখানে কতিপয় সংখ্যক সরকারি কর্মচারী দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি কালো টাকার মালিক। তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা চায়। 

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি একটি গৌরবের পেশা। একটি সরকারি চাকরি অর্জন, পরিবার-পরিজনের জন্য সোনার হরিণ। সরকারি চাকরি এনে দেয়, সেই পরিবারের সুখ শান্তি ্ও ভোগ বিলাসের উন্নত জীবন। বিলাস বহুল গাড়ি, সরকারি বাসা, সন্তানের জন্য বিভিন্ন প্রকারের রাষ্ট্রিয় সুযোগ সুবিধা। এর পরেও কয়েক বছর পর পর নতুন করে বেতন ভাতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের জীবন মান সুবিধে বেড়ে যায়। দিন শেষে তারা রাষ্ট্রের জনগনের কর্মচারী। সেই কথা মাথায় রেখে জনগনের কথাও চিন্তা করা দরকার। 

এতো সব সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র থেকে প্ওায়ার র্পও সেই সরকারি কর্মচারি,কর্মকর্তা রাষ্ট্রের অর্থ লুট করে দেশে বিদেশে অর্থের প্রাচুর্য্য গড়ে তুলে । একজন পুলিশের, সিপাহির কয়েকটি প্লাট, প্লট, বাড়ি, গাড়ি, জমি, জমার হিসেব প্ওায়া যায়। ওসি থেকে এসপি আরো বড় বড় পুলিশ অফিসারদের সম্পদের হিসেব বলতে গেলে বড় খাতা কলম নিয়ে বসতে হবে। যার জলন্ত উদাহরণ পুলিশ কর্মকর্তা বেনজির আহমদ, মতিউর সহ অসংখ্য সরকারি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারির নাম আসবে। সাথে ইউনুস সরকারের অন্তর্বর্তিকালীন উপদেষ্টাদের দুর্নীতি ও অর্থ পাঁচারের  হিসেব দেখলে চোঁখ কপালে উঠে যায়। দেশের ইউপি কার্যালয়ের সচিব থেকে গণ ভবনের কর্মচারি। একজন পিওন জাহাঙ্গিরও চারশত কোটি টাকার মালিক । এই ভাবে পঞ্চান্ন বছরের একটি স্বাধিন মানচিত্রকে লুটে পুটে খাচ্ছে দুর্নীতিবাজ আমলা কর্মচারি উপদেষ্টারা । 
বাংলাদেশ স¦াধিনতার পর অর্থনৈতিক ভাবে যে সফলতা অর্জন করেছে তা ধ্বংস করেছে এ দেশের তথাকথিত কতিপয় রাজনীতি। এ দেশে পরিচ্ছন্ন রাজনীতি, গণতন্ত্র জনগনের স¦চ্ছ ভোটাধিকার কখনো ছিল না। বাংলাদেশের উপর যাদের নজরদারি বল প্রয়োগ ও উপদেশ পরামর্শদাতা ছিল তারা কখনো বাংলাদেশকে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র সাপলাই দেয়নি। উন্নত দেশ শুধু বাংলাদেশকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে । 
বাংলাদেশ প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন করল্ওে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ, নির্দলিয় জনবান্ধব সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে দেয়নি। বাংলাদেশের এই বয়সে এই দেশ দুনিয়া জুড়ে একটি দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। কারণ এই দেশে এমন কোনো সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারি খুজে প্ওায়া যাবে না যিনি দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত নয়। ফলে বাংলাদেশের অগ্রগতি উন্নয়নের সিংহ ভাগ অর্থ দুর্নীতিবাজদের পেটে ডুকে যায়। নিঃশেষ হতে হয় জনগণকে। 

এ দেশের পচানব্বই পার্সেন্ট জনগণ কঠোর পরিশ্রমি । খালে, বিলে কাজ করে । কৃষি , খামারি , তাঁতি , দিনমজুর। তাদের পরিশ্রমের অর্থ টেক্সের টাকায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ দুর্নীতির অর্থের মালিক।

ফলে স্বাধিনতার পঞ্চান্ন বছরেও বাংলাদেশ ঋণগ্রস্থ একটি দেশ। বর্তমানে একলক্ষ প্রায় ত্রিশ হাজার মাথাপিছু ঋণ প্রতিটি নাগরিকের। আজকের জন্ম ন্ওেয়া শিশুট্ওি সেই ঋণের বোঝা বহন করে জন্ম গ্রহণ করছে। তলাবিহিন ঝুড়ির এই বাংলাদেশ প্রকৃত ভাবে লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন অগ্রগতি দৃশ্যমান দেখল্ওে দুর্নীতির পাহাড় আর ঋণের বোঝায় বাংলাদেশের জনগণ জর্জরিত । ঋণ আর দুর্নীতির শীর্ষ অবস্থানে বাংলাদেশ । 

আমাদেরকে এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অবশ্যই উন্নয়ন থেকে দুর্নীতি আলাদা করতে হবে। সেবা থেকে দুর্নীতি আলাদা করতে হবে। উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচ্ছন্ন এবং জবাবদিহিাতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতিবাজদের প্রশাসনের কোনো চেয়ারে রাখা যাবেনা । তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। পুরোনো এবং দাগি কর্মচারিদের  আইন করে চাকরি থেকে অবসরে দিতে হবে। পরিচ্ছন্ন মেধাবি যোগ্য শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান সেই জায়গায় দিতে হবে। যারা সোনার বাংলাদেশকে লুটপাট করে ডাকাতি করেছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে সম্পদ রাষ্ট্রিয় কোষাগারে ফেরত আনতে হবে। 

মহান আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কী হলো যে তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছ না? অথচ দুর্বল নারী, পুরুষ ও শিশুরা চিৎকার করে বলছে যে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের জালিমের জনপদ থেকে উদ্ধার করুন। আপনি আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে সাহায্যকারী পাঠান।’ -সূরা আন নিসা, আয়াত : ১৭৫

মানব পাচার সম্পর্কে হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছুই নেই যে তুমি এমন ব্যক্তির সঙ্গে মিথ্যার আশ্রয় নেবে, যে তোমাকে বিশ্বাস করে।’-আবু দাউদ

ইসলামে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি কিংবা প্রতারণার কোনো জায়গা নেই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা এমন কথা কেন বল, যা তোমরা বাস্তবায়ন করো না? আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য সে ব্যক্তি, যে নিজে যা বলে তা বাস্তবে করে না।’ (সুরা সাফ: ২-৩)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা : ১)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। প্রতিশ্রুতি বিষয়ে তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বানি ইসরাইল : ৩৪)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না দ্বীন ইসলামে তার কোনো অংশ নেই।’ (মুসলিম)। মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে মানব পাচারকারী চক্র অনৈতিকভাবে এই পেশা চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং প্রতারণা আর ধোঁকার এ কাজ ইসলাম সমর্থন করতে পারে না।

জনপ্রতিনিধি থেকে মন্ত্রি, এমপি, সচিব এই পর্যন্ত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি ব্যবহার করে যারাই লুটপাটের সাথে জড়িত সকলকেই আইনের আ্ওতায় এনে শাস্তি ্ও সম্পদ জব্দ করতে হবে। জনগণ আর দুর্নীতি লুটপাটের সংবাদ, অর্থপাচারের সংবাদ দেখতে চাই না। দেশের জনগন লুটপাটের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় দেখতে চায়। দুর্নীতির সমস্ত অর্থ জাতীয় কোষাগারে ফেরত আনার উদ্যেগ বাস্তবায়ন চায়। 

উন্নয়ন ধারাবাহিক ভাবে চলুক। দুর্নীতিকে সমুলে ব্যাক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে বিলুপ্ত করতে হবে। প্রশাসনের সব সেক্টরকে পুনর্বিন্যাস করে সাজাতে হবে। এ যাবৎকালে যত অর্থ পাচার হয়েছে তা ফেরত আনতে হবে। দুর্নীতিবাজরা যেনো পালিয়ে যেতে না পারে সরকারকে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের প্রত্যাশা জনগণের। 

লেখক : সংগঠক, গবেষক, কলামিস্ট                                             
ইমেইল :