নিখোঁজ শিশুউদ্ধারে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  নজরুল ইসলাম

 শিশু নিখোঁজ হওয়ার অর্থ কেবল একটি পরিবারের একজন সদস্য হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় পরিবারের নিরাপত্তাবোধ, স্বপ্ন ও স্বাভাবিক জীবন। সন্তানের খোঁজে মা-বাবা যখন থানার দরজায়, হাসপাতালের বারান্দায়, বাসস্ট্যান্ড-রেলস্টেশনে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছুটে বেড়ান, তখন রাষ্ট্রের কাছে তাদের একটিই প্রশ্ন—আমার সন্তান কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর সময়মতো দিতে না পারলে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সব প্রতিশ্রুতিই অর্থহীন হয়ে পড়েপারে ।

সম্প্রতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘মুন অ্যালার্ট’-এর তথ্যর ফলে উদ্বেগ আরোও বাড়িয়েছে। তাদের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনে সারাদেশে ৪৬ শিশু নিখোঁজ হয়েছে; এর মধ্যে ১১ জনকে জীবিত ও চারজনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ৩১ শিশুর সন্ধান মেলেনি। প্ল্যাটফর্মটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আরও বড় চিত্র উঠে এসেছে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য যাচাই করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে; ২ হাজার ৩৮ জন এখনো অনট্রেসড বা নিখোঁজ। অর্থাৎ এ সময়ের রিপোর্ট হওয়া নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশের অবস্থান তখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

সংখ্যাটি বিশাল। আবার  ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। পুলিশ বলছে, শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারিয়ে, নাম-ঠিকানা বলতে না পেরে কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে গিয়ে নিখোঁজ হয়। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক অশান্তি, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে থাকার আকাঙ্ক্ষা কিংবা অন্যান্য সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণও কাজ করে। অনলাইন জিডি চালুর পর নিখোঁজ-সংক্রান্ত রিপোর্টের সংখ্যাও বেড়েছে বলে পুলিশ বলছে।

কিন্তু কারণ যাই হোক, ২ হাজারের বেশি শিশুর দীর্ঘদিন অনট্রেসড থাকা কোনোভাবেই স্বস্তির বিষয় নয়। কারণ প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে শুরুতেই জানা সম্ভব নয় যে ঘটনাটি নিছক হারিয়ে যাওয়া, পারিবারিক কারণে ঘর ছাড়ার ঘটনা, নাকি অপহরণ, পাচার বা অন্য কোনো অপরাধের সূত্র। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি ঘটনাকেই ঝুঁকিপূর্ণ ধরে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা জরুরি।

আর এখানেই আমাদের ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারকে অনেক সময় নিজ উদ্যোগে পোস্টার ছাপাতে হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াতে হয়, বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করতে হয়। অথচ একটি শিশুর সন্ধান তৎক্ষণাৎ শুরু করার মতো সমন্বিত ও দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকা উচিত। থানা, সিআইডি, রেলওয়ে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিজিবি, হাসপাতাল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের একটি কার্যকর রিয়েল-টাইম ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

শুধু নিখোঁজের খবর প্রচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় শিশুদের তথ্যও জাতীয় পর্যায়ের একটি সমন্বিত ডাটাবেজে থাকতে হবে। ছবি, বয়স, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সম্ভাব্য ঠিকানা, উদ্ধারস্থল—এসব তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষিত থাকলে নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া শিশুর তথ্য দ্রুত মিলিয়ে দেখা সম্ভব। একই সঙ্গে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, নৌঘাট, সীমান্তবর্তী এলাকা ও জনসমাগমস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংগ্রহের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রটোকল থাকা প্রয়োজন।

মানব পাচারের ঝুঁকিও এখানে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশুরা জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, শিশুবিবাহ ও অনিরাপদ অভিবাসনসহ বিভিন্ন কারণে পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে; সংস্থাটি বলেছে, শনাক্তকরণ ও ভুক্তভোগী সহায়তা এখনো সমস্যার পুরো চিত্রের তুলনায় সীমিত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিষয়ে নতুন আইন করেছে। এই আইনে কোনো শিশু পাচারের শিকার হলে পাচারের প্রচলিত ‘মাধ্যম’—যেমন প্রতারণা বা বলপ্রয়োগ—প্রমাণের বিষয়টি একইভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই। একই আইনে ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণ, উদ্ধার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য আশ্রয় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, প্রযুক্তিও আছে। ঘাটতি প্রধানত বাস্তব প্রয়োগে—তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, তদন্তের গতি এবং জবাবদিহিতে। একটি পরিবার সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার খবর দেওয়ার পর ‘আরও একটু অপেক্ষা করুন’—এমন মানসিকতা বিপজ্জনক। শিশুর ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ; সময় নষ্ট হলে অনুসন্ধানের সুযোগ সংকুচিত হতেপারে ।

অভিভাবকদেরও আরোও বেশী সতর্ক হতে হবে। শিশুর সাম্প্রতিক ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, জরুরি যোগাযোগ নম্বর শেখানো, অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি বোঝানো এবং শিশুর চলাফেরার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ইউনিসেফও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শিশুদের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায় কেবল পরিবারের নয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। ১৫ হাজারের বেশি নিখোঁজ শিশুর রিপোর্ট এবং এখনো অনট্রেসড থাকা ২ হাজারের বেশি শিশুর সংখ্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে—এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়;  শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা।

সন্তান হারানো কোনো পরিসংখ্যান নয়। ২ হাজার ৩৮ জন নিখোঁজ মানে ২ হাজার ৩৮টি পরিবারের দরজায় অপেক্ষা, উদ্বেগ ও অন্ধকার। তাই এখন সময় শুধু নিখোঁজ শিশুর ছবি প্রচারের নয়—প্রতিটি শিশুর অবস্থান নিশ্চিত করার। সময়মতো জিডি, তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান, তথ্যের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, পাচারচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান এবং দ্রুত বিচার—সবকিছুকে একই ব্যবস্থার অংশ করা যেতেপারে।

একটি শিশুও যেন হারিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের নথিতে শুধু একটি সংখ্যা হয়ে না থাকে। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে বের করা, নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং কেন সে নিখোঁজ হলো তার উত্তর খুঁজে বের করাই হতে হবে আমাদের সবার অঙ্গীকার। 
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক।
nazrulnews1970@gmail.com