শবে মেরাজ
নবীদের নিয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর ইমামতি যে কারণে তাৎপর্যপূর্ণ
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৩ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

শবে মেরাজে মসজিদুল আকসায় পূর্ববর্তী নবীদের নিয়ে ইমামতি করেছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। পূর্ববর্তী নবীদের নিয়ে মহানবীর (সা.) ইমামতি শুধু কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং তা ছিল ইসলামের বার্তা, নেতৃত্ব ও সর্বজনীনতার এক শক্তিশালী ঘোষণা। এ ঘটনাকে নবুয়তের ধারাবাহিকতা ও ইসলামের পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন অনেক আলেম।
শবে মেরাজ : কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই মহাযাত্রা
হাদিস ও ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, এক রাতে মক্কায় চাচাতো বোন উম্মে হানির ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন মহানবী (সা.)। এ সময় তার কাছে আসেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। তিনি তাকে জাগিয়ে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। সেখানে তিনি দেখতে পান আশ্চর্যজনক বাহন বুরাক।
মহানবী (সা.) বুরাক সম্পর্কে বলেছেন, বুরাক এমন দ্রুত চলছিল যে এক পা রাখার আগেই দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছিল।অল্প সময়েই তারা পৌঁছে যান ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে, মসজিদুল আকসায়।
মসজিদুল আকসায় ঐতিহাসিক নামাজের ইমামতি
সেখানে হজরত ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)সহ বহু নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মহানবীর। মহানবী তাদের সবাইকে নিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করেন। এ নামাজে তিনি নিজেই ইমামতি করেন।
নামাজ শেষে তাকে তিনটি পানপাত্র দেওয়া হয়, একটিতে দুধ, একটিতে পানি ও আরেকটিতে মদ। তিনি দুধ পান করেন। তখন জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি ও আপনার উম্মত সঠিক পথ বেছে নিয়েছেন।
সপ্তম আসমানে আরোহণ
এরপর শুরু হয় মেরাজ বা আসমানে আরোহণের অধ্যায়। মহানবী (সা.) ও জিবরাইল (আ.) একে একে সাত আসমান অতিক্রম করেন। প্রত্যেকে আসমানে প্রবেশের সময় জিবরাইল (আ.) প্রহরী ফেরেশতাকে জানান যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই যাত্রায় তিনি হজরত আদম, ঈসা, ইয়াহইয়া, ইউসুফ, মুসা ও ইব্রাহিম (আলাইহিমুস সালাম)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।
জাহান্নামের কিছু ভয়াবহ দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেন, যেখানে কিছু মানুষ তাদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করছে। সেই দৃশ্য এতটাই হৃদয়বিদারক ছিল যে, তা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করে দেয়।
নবীদের ইমামতি : ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা
মসজিদুল আকসায় মহানবীর (সা.) নেতৃত্বে সব নবীর একসঙ্গে নামাজ আদায় করার ঘটনা বিভিন্ন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসলামে একটি মৌলিক বিশ্বাস হলো, সব নবীর মূল বার্তা ছিল এক, তা হলো এক আল্লাহর ইবাদত করা। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সেই বার্তা পূর্ণতা লাভ করে এবং নবুয়তের ধারার সমাপ্তি ঘটে।
জেরুজালেমে নবীদের এক কাতারে দাঁড়িয়ে তার ইমামতি করার অর্থ হলো—
সব নবীর বার্তা একই ধারাবাহিকতার অংশ।
তাদের লক্ষ্য ও মর্যাদা অভিন্ন।
আর ইসলামের মাধ্যমেই সেই বার্তা চূড়ান্ত ও সংরক্ষিত রূপ পেয়েছে।
এ ঘটনার মাধ্যমে আরও বুঝা যায় যে, জেরুজালেম শুধু ইহুদি বা খ্রিস্টানদের জন্য নয়; মুসলমানদের কাছেও পবিত্র শহর। কারণ এখানেই মহানবী সব নবীর স্বীকৃত নেতা হিসেবে ইমামতি করেছেন। এই কারণে শহরটি আসমানি সব ধর্মাবলম্বীর কাছেই বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন।
ইসলামের সর্বজনীন বার্তা
মেরাজের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো ইসলামের সার্বজনীনতা। আল্লাহ চাইলে মহানবীকে মক্কা থেকেই সরাসরি আসমানে তুলে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাকে প্রথমে তৎকালীন অনারব অধ্যুষিত শহর জেরুজালেমে নিয়ে যান। সেখানে তাকে নবীদের ইমাম বানিয়ে তারপর আসমানে তোলা হলো।
এর মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে, ইসলাম শুধু আরবদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত ধর্ম।
ইসলামী গবেষকদের মতে, এই ঘটনাই ইঙ্গিত করে যে আগের ধর্মগ্রন্থগুলোতে যে বিকৃতি এসেছিল, ইসলাম এসে তা সংশোধন করেছে এবং একটি পরিপূর্ণ ও সংরক্ষিত জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়েছে।
মেরাজের রাতে নবীদের নিয়ে মহানবীর (সা.) ইমামতি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ইসলামের নেতৃত্ব, পূর্ণতা ও বিশ্বজনীনতার এক জীবন্ত ঘোষণা। মুসলমানদের জন্য এতে রয়েছে আত্মবিশ্বাসের বার্তা—ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন মতবাদ নয়, বরং সব আসমান ধর্মের চূড়ান্ত ও সংরক্ষিত রূপ।
