পরিবহনে দৈনিক চাঁদা আদায় হয় শতকোটি টাকা
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:০৪ | অনলাইন সংস্করণ
মোস্তফা সারোয়ার:

চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় গেল শুক্রবার দুপুর বিকাল পৌনে ৩টার সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ি মাছের আড়ত সংলগ্ন সুফিয়া গার্মেন্টের পাশে খায়রুল নামের এক চালককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ বলছে, হত্যাকান্ডটি চাঁদার জন্য নয়, সিটে যাত্রী উঠানোকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২৩ ফেব্রুয়ারী ময়মনসিংহ ত্রিশালে চাদাবাজি বন্ধের দাবিতে বাস চালকরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে। আগে সেই রুটে চাঁদা নিতো ২০ টাকা এখন ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ২২ ফেব্রুয়ারী মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ চাঁদাবাজ ফারুক নামক জনৈককে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে মাইকিং করে তাকে পুরো এলাকা ঘুরিয়েছে। এদিকে শনিবার রাতে চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের দাবীতে আদাবর থানা ঘেরাও করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। কোন ভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছেনা চাঁদাবাজি। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে পরিবহন সেক্টরে।
রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে দৈনিক প্রায় শতকোটি টাকা চাঁদাবাজীর অভিযোগ উঠেছে। এসব চাঁদাবাজির পেছনে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে , কোথাও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে। কোথাও আবার পৌর টোলের সঙ্গে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে দায়িত্বপালন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং থানা পুলিশের এক শ্রেণির অসাধু সদস্য এসব চক্রের সঙ্গে যুক্ত। নিরুপায় হয়ে পরিবহণ চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এসব চাঁদা পরিশোধ করে যাচ্ছেন।
এদিকে পরিবহণে চাঁদাবাজির ফলে পরিবহণ ভাড়াও বাড়ে। সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর দাম হয়ে যায় আকাশছোঁয়া। দিনশেষে সব গিয়ে পড়ে জনগণের ঘাড়ে। সমঝোতা সিস্টেমের নামে চাঁদাবাজির খেসারত দিতে হয় আমজনতাকে। এর ফলে সমাজের মধ্যবিত্তের যাপিত জীবন আরও দুঃসহ হয়ে ওঠে। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই চাঁদাবাজি আর বন্ধ হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের সদস্যদের কল্যাণের নামে এভাবে চাঁদা আদায় করা হলেও বাস্তবে যা হচ্ছে তা স্রেফ চাঁদাবাজি। এসব চাঁদার ৯০ ভাগ চালক-কন্ডাকটরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নেওয়া হয়। চাহিদামাফিক চাঁদার টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর করা ছাড়াও মারধরও করা হয়। এছাড়া মাঠপর্যায়ে থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদার টাকা কত হাত ঘুরে কোথায় যায় এবং কারা এর ভাগ পায়-সে বিষয়ে কেউ মুখে খুলতে চান না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ সেক্টরের সাধারণ মালিক-শ্রমিকদের অনেকে আমার বার্তাকে জানিয়েছেন, মূলত এসব চাঁদার টাকার ওপর ভর করে স্বাধীনতার পর এক শ্রেণির মালিক-শ্রমিক নেতারা জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীও হতে পেরেছেন। সরকার বদল হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এসব প্রভাবশালী নেতা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের আপস করে চলেন। সারা দেশে এ সেক্টরের লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিকদের পুঁজি করে রাজনীতির হাত শক্তিশালী করাসহ রাজনীতিকে জিম্মি করা হয়।
বিপরীতে সাধারণ পরিবহণ শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। তাদের রাত-দিনের ঘামঝরা অমানুষিক পরিশ্রমকে পুঁজি করে বেশির ভাগ নেতা রাজকীয় জীবনযাপন করেন। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এসব প্রভাবশালীরা কঠোর আইন করতেও বাধা দেন। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নানা কারণে এ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এ কারণে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা কখনো নেওয়া হয় না। বিপরীতে সমঝোতার নামে চাঁদা নেওয়া হয় বলে এক ধরনের বৈধতা দিয়ে দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক মতবিনিময় সভা শেষে পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহণ ও সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহণের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো।’ এদিকে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সিটি বাসের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এসব বাস থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। এ হিসাবে সিটি বাস থেকে দৈনিক মোট চাঁদা আদায় হয় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। আর দূরপাল্লার বাস চলাচল করে ৬০ হাজারের বেশি। এসব বাস থেকে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। অর্থাৎ এ খাত থেকে দৈনিক মোট চাঁদা আদায় করা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।
এছাড়া রাজধানী ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে ১৮ হাজার। এসব থেকে দৈনিক গড়ে চাঁদা তোলা হয় ১৫০ টাকা। এ হিসাবে ঢাকার সিএনজি অটোরিকশা থেকে দৈনিক মোট চাঁদা তোলা হয় ২৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে ১৫ হাজার। সেসব রিকশা থেকে দৈনিক গড়ে চাঁদা আদায় করা হয় ৮০ টাকা করে। এ হিসাবে সেখান থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় হয় ১২ লাখ টাকা।
একইভাবে চাঁদা আদায় করা হয় রাজধানী ঢাকায় চলাচল করা প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে। দৈনিক গড়ে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। অর্থাৎ এ খাত থেকে দৈনিক ১৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে দেশজুড়ে চলাচল করে আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব অটোরিকশা থেকে গড়ে ৮০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ হিসাবে দৈনিক ৪০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় ট্রাক থেকে।
সারা দেশে দৈনিক চলাচলকারী ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। দৈনিক গড়ে ১ হাজার টাকা করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া টেম্পো, লেগুনাসহ এই শ্রেণির যানবাহন রয়েছে ৮ হাজারের বেশি। এসব পরিবহণ থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। যা থেকে আসে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সব খাত মিলিয়ে প্রতিদিন পরিবহণ সেক্টর থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু আমার বার্তাকে বলেন, ২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে শ্রমিক ফেডারেশনের নামে সরাসরি কোনো চাঁদা আদায় করা হয় না। তবে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি এখনো চাঁদা তুলছে।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিক ফেডারেশন শ্রমিক সংগঠন পরিচালনা ও শ্রমিকদের কল্যাণের নামে আগে চাঁদা তুলত, এখন তা নেওয়া হচ্ছে না। তবে নানা নামে, নানা খাতে চাঁদা নেওয়া তো বন্ধ হয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন খাতে পরিবহণ মালিকদের চাঁদা দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ তার মতে, ‘এটা সেদিনই বন্ধ হবে, যেদিন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠবে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম আমার বার্তাকে বলেন, পরিবহণ মালিক সমিতি টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার জন্য সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে কিছু টাকা আদায় করে থাকে। যেটা পরিবহণ মালিকরা স্বেচ্ছায় দিয়ে যাচ্ছেন। ওই টাকা টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ বহন করা হয়। এটাকে আমরা চাঁদা বলি না, এটা ব্যবস্থাপনা খরচ। সড়ক পরিবহণমন্ত্রীও এভাবে টাকা নেওয়াকে চাঁদা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি তো আলোচনার ভিত্তিতে টাকা নিচ্ছে। পরিবহণ মালিকরা তা স্বেচ্ছায় পরিশোধ করছেন। যারা সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদেরও পরিবহণ রয়েছে। তবে এর বাইরেও সড়কে পদে পদে পরিবহণগুলোকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কাছ থেকে পৌরকরের পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা জোরপূর্বকভাবে আদায় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি (হাইওয়ে পুলিশ) মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা আমার বার্তাকে বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এজন্য গত দেড় বছরে মহাসড়কে চাঁদাবাজি নেই বললেই চলে। তারপরও কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে পুলিশ। তবে এখন মহাসড়ক নয়, টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে শোনা যায়।
আমার বার্তা/এমই
