ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজউকের বাইরে খাম লেনদেন

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ১৭:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ

  মুক্তার হোসেন:

  • লিটন সরকারের স্ববিরোধী জবানবন্দিতেই ঘুষের অকাট্য প্রমাণ
  • প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে দাপট দেখানোর চেষ্টা
  • অভিযানের পর উচ্ছেদকৃত পক্ষের সাথে গোপন বৈঠক
  • ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ার নিয়ে আইনি প্রশ্ন

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপপরিচালক মো. লিটন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে উচ্ছেদ-পরবর্তী বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ গ্রহণের  ডিজিটাল ও মৌখিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। অফিস শেষে রাজউক ভবন থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে আলাদা আলাদা পথে সংসদ ভবন এলাকায় গিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে গোপন সাক্ষাৎ এবং একটি চারকোনা ঠাসা খাম কোটের পকেটে নেওয়ার একটি ভিডিওচিত্র এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অভিযুক্ত কর্মকর্তার নিজের দেওয়া আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যই এখন তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের সবচেয়ে বড় আইনি প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলশান এলাকায় একটি উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার পর এই খাম লেনদেনের ঘটনাটি ঘটে। এই বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট লিটন সরকারকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি খাম নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে সেটি ঘুষের টাকা নয় দাবি করে তিনি এক অদ্ভুত সাফাই পেশ করেন। তার দাবি, ওই উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার পর ওনার পূর্বপরিচিত (প্রথমে একাধিক ছবি দেখালে চিনেন না বলেন, পরে ভিডিও দেখালে পূর্ব পরিচিত বলেন। কিন্তু ব্যক্তির নাম বা রেস্টুরেন্টের নাম, ঠিকানা বলতে পারেননি) এক রেস্টুরেন্ট মালিক একটি আদালতের আদেশ নিয়ে আসেন। তিনি ওই ব্যক্তির সাথে রাস্তায় সাক্ষাৎ করে খামটি গ্রহণ করেন এবং রেস্টুরেন্ট পরিচালনার বিষয়ে কোর্টের অর্ডারসহ রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর একটি দরখাস্ত করার পরামর্শ দেন।

ম্যাজিস্ট্রেটের এই জবানবন্দিতেই লুকিয়ে আছে অপরাধের অকাট্য স্বীকারোক্তি। ভিডিওচিত্রে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, খামটি সতর্কতার সাথে হাতবদল হওয়ার পর তিনি এক মুহূর্তের জন্যও তা খুলে দেখেননি, সরাসরি পকেটে রাখেন। 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, খাম না খুলেই ভেতরের কাগজটি সুনির্দিষ্টভাবে 'কোর্টের অর্ডার' ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া এবং সেই অনুযায়ী রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর দরখাস্ত করার দাপ্তরিক পরামর্শ দেওয়া যৌক্তিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। যদি খামের ভেতরে টাকা না থেকে আইনি কাগজই থাকবে, তবে খাম না খুলে তিনি কাগজের সত্যতা ও পরামর্শ দিলেন কীভাবে—তা তার নিজের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ স্ববিরোধী ও মিথ্যা প্রমাণ করে। তিনি এতদূর গেলেন ডকুমেন্ট নিয়ে পরামর্শ দিতে অথচ তিনি তা খুলেই দেখেননি, তাহলে তিনি মোবাইলেই পরামর্শ দিতে পারতেন বা খামটি না নিয়েও পরামর্শ দিতে পারতেন। খামটি নেওয়ার উদ্দেশ্য তাহলে কি?

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় আইনি ও যৌক্তিক প্রশ্নটি উঠেছে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাজের প্রটোকল নিয়ে। মোঃ লিটন সরকার নিজেই উক্ত এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ম্যাজিস্ট্রেট যখন নিজে কোনো মামলার বিচারক বা উচ্ছেদ অভিযানের পরিচালক হন, তখন উচ্ছেদ-সংশ্লিষ্ট কোনো সংক্ষুব্ধ বা সুবিধাভোগী ব্যক্তির সাথে অফিসের বাইরে অন্য কোথাও ব্যক্তিগতভাবে বা গোপনে সাক্ষাৎ করার কোনো আইনগত বা নৈতিক সুযোগ তার নেই। ফৌজদারি কার্যবিধি এবং জুডিশিয়াল কোড অব কন্ডাক্ট অনুযায়ী, এটি সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ এবং বিচারিক নিরপেক্ষতার চরম লঙ্ঘন। উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পূর্ণ সরকারি দায়িত্ব, তাই এই সংক্রান্ত যেকোনো নথি বা আদালতের আদেশ রাজউকের রেকর্ড রুম বা আইন শাখায় দাপ্তরিকভাবে জমা হওয়ার কথা। তা না করে, নিজে অভিযান পরিচালনার পর গোপনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে খাম পকেটে রাখা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের শামিল। তিনি এটাও স্বীকার করেন যে উচ্ছেদ অভিযানে রাজউকের অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের দ্বারা বিভিন্ন অনিয়ন হয়, তবে তিনি সে ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেন।

ভিডিওতে খামটির জ্যামিতিক আকৃতি ও পুরুত্ব স্পষ্টতই কারেন্সি নোটের বান্ডিলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, যা এ-ফোর সাইজের আইনি কাগজের ভাঁজের চেয়ে অনেক ছোট কিন্তু পুরু। একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার রাস্তার ওপর এভাবে খাম গ্রহণ করা ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ এবং  'সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত‌' সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল।

ঘটনার মোড় আরও নাটকীয় রূপ নেয় যখন এই বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয় এবং চেয়ারম্যান লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুসন্ধানের বিষয়টি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রতিবেদকের মুঠোফোনে কল করেন অভিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ লিটন সরকার। ফোনে তিনি নিজেকে একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাপট দেখানোর চেষ্টা করেন এবং আইনি পদক্ষেপের হুমকি দেন। নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি ভিডিওতে থাকা ওই রেস্টুরেন্ট মালিককে নিজের পক্ষে ‘সাক্ষী’ হিসেবে হাজির করার দাবি করলেও, এই প্রতিবেদক যখন উক্ত সাক্ষীর নাম, কোম্পানির নাম ও মুঠোফোন নম্বর জানতে চান, ম্যাজিস্ট্রেট লিটন সরকার তা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান। 

রাজউকে এই ধরনের অনিয়ম ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি নতুন নয়। এর আগে গুলশানে রাজউক চেয়ারম্যানের সরকারি বাংলো বাড়ি সংস্কারেও ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ পায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ৩০ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও রহস্যজনক কারণে তা ফাইলবন্দি রয়েছে এবং কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মাঠপর্যায়ের ম্যাজিস্ট্রেটদের উচ্ছেদ কেন্দ্রিক এই ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন এবং চেয়ারম্যানের বাংলো সংস্কারের দুর্নীতি নিয়ে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

দুদকের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে দুদক দ্বারা তদন্ত করলে অভিযুক্ত ব্যক্তির ঘুষ লেনদেন এর বিষয়টি প্রমাণিত হবে।


আমার বার্তা/এমই