শওকত আলীর অর্থপাচার অনুসন্ধানে তৎপরতা বাড়িয়েছে দুদক
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ২১:২২ | অনলাইন সংস্করণ
জাহিদুল আলম:

ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নতুন গতি এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যুক্তরাজ্যে তাঁর ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ শনাক্ত এবং অপ্রদর্শিত বিদেশি সম্পদের কারণে প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা জরিমানার ঘটনার পর এবার তাঁর ও পরিবারের আর্থিক লেনদেন, আমদানি বাণিজ্য এবং বিদেশে সম্পদ অর্জনের তথ্য যাচাইয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালাচ্ছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, শওকত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মোট ১৮৭টি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাহাজ আমদানির নামে খোলা ঋণপত্র (এলসি) এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে সম্পদ কেনার তথ্য যাচাইয়ে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর বিষয়ও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৮টি ব্যাংকে শওকত আলী, তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বেরিন, মেয়ে জারা নামরীন, ছেলে জারান আলী চৌধুরী এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ১৮৭টি হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের চার সদস্যের নামে ৪১টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪৬টি হিসাব।
দুদকের নথি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা জমা এবং ৮ হাজার ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ওই সময় হিসাবগুলোতে স্থিতি ছিল ১৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এসব হিসাবের কেওয়াইসি, লেনদেন বিবরণী ও অন্যান্য সহায়ক নথি বিশ্লেষণ করছে অনুসন্ধানকারী দল।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ১ জুলাই দুদকের উপপরিচালক মো. মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি দল চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কাছে শওকত আলীর মালিকানাধীন এসএন করপোরেশনের জাহাজ আমদানি ও সংশ্লিষ্ট এলসির নথি চেয়েছে। ১০ জুলাইয়ের মধ্যে তথ্য দেওয়ার সময়সীমা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা পাওয়া যায়নি। প্রয়োজন হলে নতুন করে তাগিদপত্র পাঠানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর ইস্টার্ন ব্যাংকের কাছে শওকত আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব, জাতীয় পরিচয়পত্র, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) এবং পাসপোর্টের কপি চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি আরেকটি চিঠিতে তাঁদের আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুসন্ধান এখন ব্যাংক হিসাবের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমদানি বাণিজ্য, বিদেশি কোম্পানি ও বিদেশে অর্জিত সম্পদের দিকেও বিস্তৃত হয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখার মাধ্যমে এসএন করপোরেশনের পক্ষে তিনটি এলসি খোলা হয়। এসব এলসির সুবিধাভোগী ছিল ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে একই ঠিকানায় নিবন্ধিত রেড রুবি গ্রুপ লিমিটেড, ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড এবং কলাম্বিয়া সিস লিমিটেড। অনুসন্ধানকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবসায়িক অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনটি এলসির মোট মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১৫ সালের একটি এলসির মূল্য ছিল ৭৪ লাখ ৯৬ হাজার ডলার, ২০২০ সালেরটি ৪ লাখ ৬৪ হাজার ডলার এবং ২০২৩ সালেরটি ২১ লাখ ৪১ হাজার ডলার। দুদক এখন এসব এলসির বিপরীতে জাহাজের প্রকৃত মূল্য, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, অর্থের গন্তব্য এবং আমদানি নথির সত্যতা যাচাই করছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ২০১২ সাল থেকে এসএন করপোরেশন পুরোনো জাহাজ আমদানির জন্য ১৪১টি এলসি খুলেছে। এসব লেনদেন এবং শওকত পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, "অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করছেন। অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ সম্পন্ন হলে শওকত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পাশাপাশি বিদেশে থাকা ফ্ল্যাট, কোম্পানি ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানোরও প্রস্তুতি চলছে।
আমার বার্তা/এমই
