ছোট ভাইয়ের হাসিতে লুকিয়ে ইয়ামালের জীবনের গল্প

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৭:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

গ্যালারির ছোট্ট মুখ জিতে নিল কোটি হৃদয়

বিশ্বকাপে নায়ক হওয়ার জন্য সব সময় গোল করতে হয় না। কখনো কখনো একটি নিষ্পাপ হাসি, একটু দৌড়, দুই হাত তুলে আনন্দে চিৎকার করা কিংবা বড় ভাইকে দেখে জিভ বের করে দুষ্টুমি করাই কোটি মানুষের হৃদয় জিতে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট!

২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের জার্সিতে আলো ছড়িয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। প্রথমবার খেলতে এসেই জিতেছেন বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু মাঠের বাইরে আরেক ‘ইয়ামাল’ নিঃশব্দে জিতে নিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসা। তার নাম কেইনে ইয়ামাল। বয়স মাত্র তিন বছর।

স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ছোট্ট এই শিশুকে দেখা যায় কখনো স্পেনের পতাকা হাতে, কখনো দুই হাত তুলে চিৎকার করতে, আবার কখনো ক্যামেরা নিজের দিকে ঘুরতেই জিভ বের করে দুষ্টুমি করতে। সেই মুহূর্তগুলো কয়েক সেকেন্ডের হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। গতকাল আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেন যখন শিরোপা উৎসবে মেতে তখনো আলো কেড়ে নিলেন এই শিশু। মাঠে সবার মধ্যমনি যেন হয়ে উঠলেন শিশু সুলভ চঞ্চলতায়!

অনেকেই মজা করে লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা হয়তো লামিনে নয়, কেইনে।’

এর আগে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়ের পর ঘটেছিল সবচেয়ে মধুর দৃশ্যটি। মাঠে খেলোয়াড়রা যখন সেমিফাইনাল উদযাপনে ব্যস্ত, তখন স্টেডিয়ামের বিশাল পর্দায় ভেসে ওঠে ছোট্ট কেইনের মুখ। সে জিভ বের করে একের পর এক মজার মুখভঙ্গি করছে। নিচে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা লামিনে ইয়ামাল বড় পর্দার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।

পরে সাংবাদিকদের ইয়ামাল বলেন, ‘এই দুষ্টুমির খবর আগেই জানতাম। আমি ফিজিওথেরাপি নিচ্ছিলাম। তখন মায়ের ফোন থেকে কেইনে আমাকে ফোন করে বলেছিল, আগামীকাল আমি জিভ বের করব। তাই ওকে পর্দায় দেখেই আমার হাসি পেয়ে যায়।’

এই কথাগুলোতে ফুটবলারের চেয়ে একজন বড় ভাইকেই বেশি খুঁজে পাওয়া যায়।

কেইনে নতুন কোনো চরিত্র নয়। ২০২৪ সালে স্পেন ইউরো জেতার পর বড় ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে নেমে উদযাপন করেছিল সে। পরে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে ছোট্ট কালো স্যুট পরে লাল গালিচায় হাঁটতেও দেখা গেছে তাকে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ যেন তাকে আলাদা একটি পরিচয় দিয়েছে-স্পেনের সবচেয়ে আদরের সমর্থক।

কেইনের প্রতি নিজের ভালোবাসা নিয়ে কখনো রাখঢাক করেন না ইয়ামাল।

সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছোট ভাই আমার কাছে সবকিছু। আমি ওকে এতটাই ভালোবাসি, কখনো কখনো মনে হয় ও যেন আমার নিজের ছেলে।’ -এই একটি বাক্যের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প!

লামিনে ও কেইনের মা একই হলেও তাদের বাবারা আলাদা। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর খুব সাধারণ জীবন কেটেছে ইয়ামালের। এমনও সময় ছিল, যখন একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে রান্নাঘর আর শোবার ঘর ছিল একই জায়গায়।

আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ট্রফি বা ব্যক্তিগত পুরস্কারের কথা বলেন না।

একটি পডকাস্টে ইয়ামাল বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় সুখ হলো, আমি এখন আমার মাকে হাসতে দেখি। আর আমার ভাই সেই শৈশবটা পাচ্ছে, যেটা আমি কখনো পাইনি।’

বিশ্বকাপ চলাকালে তার আরেকটি মন্তব্যও মানুষের মন ছুঁয়েছে। তারকা হওয়ার চাপ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে। আমার বাবা রাস্তায় কাজ করে পরিবার চালিয়েছেন। ওটাই ছিল আসল চাপ। আমার কাজ শুধু ফুটবল খেলা এবং মানুষকে আনন্দ দেওয়া।’

হয়তো সেই কারণেই প্রতিটি জয়ের পর ট্রফির আগে ইয়ামালের চোখ খোঁজে গ্যালারির একটি ছোট্ট মুখ। আর গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা তিন বছরের সেই শিশুটিও খোঁজে তার বড় ভাইকে।

বিশ্বকাপে অসংখ্য গোল হয়েছে, নতুন নতুন রেকর্ডও দেখা গেল, চ্যাম্পিয়ন স্পেনের হাতে উঠল সোনালি ট্রফি। কিন্তু এই আসরের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলোর একটি হয়তো থেকে যাবে অন্য কোথাও-স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছোট্ট শিশুর হাসিতে, যে শুধু তার ভাইকে খেলতে দেখেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে যায়!


আমার বার্তা/এমই