জমির জট খুলেছে, এবার রামুতে স্বপ্নের ফুটবল মাঠ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

কখনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কারণে আটকে গেছে, কখনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায়। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, ফিফার অর্থায়নে বাংলাদেশের বহু প্রতীক্ষিত ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার বুঝি আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে!

কক্সবাজারের রামুতে ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য অবশেষে ১৫ দশমিক ২০ একর জমি পেয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি লিজে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া এই জমির দলিল গতকাল বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের হাতে তুলে দিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এম এ মান্নান।

একটি জমির দলিল হস্তান্তরের ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এর তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ এই কাগজের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি অবকাঠামোর স্বপ্ন, যেখানে ভবিষ্যতের জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা তৈরি হবেন, বয়সভিত্তিক দলগুলো অনুশীলন করবে, কোচরা নিজেদের দক্ষতা বাড়াবেন এবং ফুটবলকে আরও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এই স্বপ্নের শুরু প্রায় চার বছর আগে। তখন বাফুফের সভাপতি ছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। ফিফার অর্থায়নে টেকনিক্যাল সেন্টার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার পর রামুর খুনিয়াপালংয়ে বাফুফেকে ২০ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। কিন্তু পরে দেখা যায়, প্রস্তাবিত জায়গাটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। পরিবেশগত বিষয়টি সামনে আসতেই শুরু হয় আপত্তি, তৈরি হয় অনিশ্চয়তা!

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই বরাদ্দ বাতিল করে বিকল্প জমি খোঁজার নির্দেশ দেয়। তখন প্রকল্পটি আবারও যেন শূন্য থেকে শুরু করার অবস্থায় চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত নতুন ঠিকানা মিলেছে রামুর রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজায়, মহাসড়কের পাশে স্বপ্নতরী বিনোদন কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায়। আগের ২০ একরের জায়গার বদলে এবার জমির পরিমাণ ১৫ দশমিক ২০ একর। তবে জমির পরিমাণ কমলেও প্রকল্পের স্বপ্ন ছোট হচ্ছে না।

বাফুফের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে তৈরি হবে তিনটি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ। খেলোয়াড় ও কোচদের থাকার জন্য থাকবে দুটি চারতলা ডরমিটরি। থাকবে জিমনেশিয়াম, সুইমিংপুল, ইনডোর ট্রেনিং সুবিধা, শ্রেণিকক্ষ, ক্যাফেটেরিয়া ও কনফারেন্স সুবিধা।

তবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত মাঠ কিংবা ভবন নয়, বরং এর ভেতরে তৈরি হতে যাওয়া ফুটবল-সংস্কৃতি। জাতীয় পুরুষ ও নারী দল তো থাকবেই, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০ ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলসহ বয়সভিত্তিক সব দলের প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকবে এখানে।

খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি কোচ তৈরির ব্যবস্থাও থাকবে। স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিকেল ইউনিট, ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, ভিডিও অ্যানালাইসিস ল্যাব এবং কোচিং এডুকেশন সেন্টারের মতো সুবিধা থাকবে প্রকল্পে। শুধু ফুটবলারকে মাঠে দৌড় করানোর জায়গা নয়, একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতা থেকে শুরু করে তাঁর খেলার বিশ্লেষণ-সবকিছুকে একই ছাদের নিচে আনার পরিকল্পনা।

প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা, ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফিফার অর্থায়নে নির্মাণ হবে এই কেন্দ্র। জমি বাফুফের নামে হস্তান্তরের পর নির্মাণকাজ শুরুর পথও খুলে যাবে।

বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটনের চোখেও এখন সবচেয়ে বড় কাজ দ্রুত নির্মাণ শুরু করা। তার আশা, ‘এখন আমাদের লক্ষ্য দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করে দেশের ফুটবলের জন্য একটি স্থায়ী, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা।’

ফিফার নির্বাহী কমিটি ২০২২ সালে বাংলাদেশে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় সম্ভাব্য স্থান দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত কক্সবাজারকে বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু জায়গা নির্ধারণের পরই প্রকল্পের সামনে চলে আসে সবচেয়ে বড় বাধা-জমি।

সেই বাধা কাটতেই কেটে গেল প্রায় পাঁচ বছর!

বাংলাদেশের ফুটবলে অবকাঠামোর অভাব নতুন কোনো গল্প নয়। জাতীয় দল থেকে বয়সভিত্তিক দল-প্রশিক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পর্যাপ্ত আধুনিক ও স্থায়ী সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ভালো মানের প্রস্তুতির জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রয়োজনও তৈরি হয় প্রায়ই। রামুর এই কেন্দ্র সেই নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে স্বপ্নের ভবন, মাঠ কিংবা আধুনিক ল্যাব তৈরি হলেই গল্প শেষ হবে না। আসল পরীক্ষা শুরু হবে তার পর-এই অবকাঠামো থেকে বাংলাদেশ কতজন ভালো ফুটবলার তৈরি করতে পারে, কতজন কোচকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে পারে, আর জাতীয় দলের জন্য কতটা শক্ত ভিত তৈরি করতে পারে!