
ঘুমের সমস্যার জন্য প্রায়ই নীল আলোকে দায়ী করা হয়, কিন্তু বিষয়টি আরও জটিল। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় চোখে পৌঁছানো উজ্জ্বল আলো মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমাতে পারে। মেলাটোনিন এমন একটি হরমোন, যা শরীরকে জানান দেয় যে, এখন জৈবিকভাবে রাতের সময়।
রাত ৯টায় শান্ত কোনো অনুষ্ঠান দেখা একটি শিশুর জন্য যে ধরনের উদ্দীপনা তৈরি করে, প্রতিযোগিতামূলক গেম খেলা তা করে না। ফলে অভিভাবকদের শুধু স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নয়, কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করা উচিত। আদর্শগতভাবে ঘুমানোর আগের শেষ এক ঘণ্টায় উত্তেজনামূলক ডিভাইস ব্যবহার এড়িয়ে চলা ভালো, তবে সব শিশুর জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
১. অনিয়মিত ঘুমের সময় সোশ্যাল জেট ল্যাগ তৈরি করতে পারে
শিশুরা প্রতি রাতে তাদের জৈবিক ঘড়ি নতুন করে ঠিক করে নেয় না। সপ্তাহের কর্মদিবস ও ছুটির দিনের ঘুমের সময়ের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা অনেকটা জেট ল্যাগের মতো। এই ঘটনাকে সোশ্যাল জেট ল্যাগ বলা হয়।প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস অনেক সময় শিশুকে বারবার তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়ানোর চেষ্টার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। সকালে প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় কাটানো সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি খাবার, খেলাধুলা, অন্যান্য কার্যক্রম এবং ঘুমের সময় নিয়মিত রাখাও শরীরকে ঘুমের প্রস্তুতির সংকেত দেয়।
২. ঘুমের পরিবেশের দিকেও নজর দিন
কিছু শিশু নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতি ছাড়া ঘুমাতে পারে না যেমন পাশে বাবা-মায়ের শুয়ে থাকা, টেলিভিশন চালু থাকা কিংবা ক্রমাগত দোলানো।
এগুলোকে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত অভ্যাস বা স্লিপ অ্যাসোসিয়েশন বলা হয়। এগুলো নিজে থেকেই ক্ষতিকর নয়। তবে সমস্যা তখন হতে পারে, যখন রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভেঙে গেলে শিশু আবার ঘুমাতে যেতে ওই একই পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
হঠাৎ করে শিশুর পরিচিত সবকিছু সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা সাধারণত সহজ হয়। বাবা-মা ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি কমাতে পারেন, পেছনের শব্দ বা অন্যান্য উদ্দীপনা কমাতে পারেন অথবা স্ক্রিনের পরিবর্তে শান্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য কোনো বিকল্প দিতে পারেন।
৩. দিনের অভ্যাসই অনেক সময় রাতের ঘুম নির্ধারণ করে
শুধু ঘুমের সময় ঠিক করলেই ভালো ঘুম নিশ্চিত হয় না। বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা যদি দিনের বড় একটি সময় ঘরের ভেতরে কাটায় এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডে পর্যাপ্তভাবে অংশ না নেয়, তাহলে সন্ধ্যার মধ্যে তাদের শরীরে পর্যাপ্ত ঘুমের চাপ তৈরি নাও হতে পারে।
তাই অভিভাবকদের নিশ্চিত করা উচিত যে শিশুরা পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে, প্রাকৃতিক দিনের আলো পাচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে ঘুম বা ন্যাপ নিচ্ছে।
৪. ক্যাফেইন এড়িয়ে যাওয়া
কোলা জাতীয় পানীয়, এনার্জি ড্রিংক এবং কিছু চকোলেটজাত পণ্যে থাকা ক্যাফেইনও ঘুমে বাধা দিতে পারে, বিশেষ করে যেসব শিশু ক্যাফেইনের প্রভাবে বেশি সংবেদনশীল।
কখন ঘুমের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন
শিশুর নিয়মিত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, অস্থির ঘুম, সকালে মাথাব্যথা কিংবা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাবকে শুধু খারাপ অভ্যাস হিসেবে দেখলে চলবে না। এসব লক্ষণ অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বা অন্য কোনো ঘুমের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি ঘুমের সময়সূচি তৈরি করা নয়। বরং এমন একটি নিয়মিত ছন্দ তৈরি করা, যাতে শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্ক ও শরীর পর্যাপ্ত এবং প্রশান্তিদায়ক ঘুম পায়। আলো, সময়, মানসিক উত্তেজনা এবং দৈনন্দিন রুটিনে ছোট ছোট পরিবর্তন অনেক সময় ঘুমের সময় শিশুর সঙ্গে আরেকটি লড়াই করার চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।

