
আসসালামুআলাইকুম। সুপ্রভাত। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস।
নতুন সপ্তাহের প্রথম সকালে মনে হলো, আজকের কথাটি শুরু করা যাক একটি পুরোনো অথচ চিরনতুন শব্দ দিয়ে—প্রতিযোগিতা। জীবনে যেমন, রাষ্ট্রেও তেমনি। যেখানে প্রতিযোগিতা নেই, সেখানে যোগ্যতার পরীক্ষা নেই; আর যোগ্যতার পরীক্ষা না থাকলে একসময় দক্ষতার জায়গা নেয় আনুগত্য, বাজারের জায়গা নেয় একচেটিয়া দখল, আর গণতন্ত্রের জায়গা নেয় আনুষ্ঠানিকতা। রবিবারের সকালটি তাই মন্দ নয়—রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ—সবখানেই আজ প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রশ্নটি দেখা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ছবিটিও এবার কিছুটা অন্যরকম। বিএনপি চাইলেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনটি করে ফেলতে পারছে না। আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শনিবার রাতে মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়; আজ রোববার প্রার্থী চূড়ান্ত করার কথা। ফলে ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ হলেই যে রাষ্ট্রপতির নাম নির্ধারিত হয়ে যাবে, তা আর বলা যাচ্ছে না—প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে ২০ আগস্ট ভোটেই সিদ্ধান্ত হবে। আর সত্যি বলতে কী, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকাই ভালো। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানে শুধু দুইজন প্রার্থী নয়; এটি জনমতের একটি আয়না। এতে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে, ভোটের অর্থবহতা বাড়ে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংবিধানিকভাবে বৈধ হতে পারে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হওয়া গণতন্ত্রের সৌন্দর্যকে একটু বেশি স্পষ্ট করে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যে তাই গণতন্ত্রের একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে—ক্ষমতা যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতা অর্জনের পদ্ধতি। একই কথা বাজারের ক্ষেত্রেও সত্য। জ্বালানি খাতে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার গুজব নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য ২০২৬ সালের একটি নীতিমালার খসড়া তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ সেখানে নেই; বরং সংকটকালে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি সরবরাহকে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ করাই লক্ষ্য।
নীতিটির উদ্দেশ্য শুনতে ভালো। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতির সৌন্দর্য তার ঘোষণায় নয়, প্রয়োগে। ‘বেসরকারি খাত’ শব্দটি যেমন উন্নয়নের সম্ভাবনা, তেমনি ‘বিশেষ সুবিধা’ শব্দটি জনমনে সন্দেহের জন্ম দেয়। অতীতের অভিজ্ঞতায় মানুষ দেখেছে—নীতিমালা কখনো কখনো সবার জন্য দরজা খোলার নামে কারও জন্য নির্দিষ্ট জানালা খুলে দেয়। তাই এবার প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে প্রবেশাধিকার হবে সমান, মানদণ্ড হবে প্রকাশ্য, প্রতিযোগিতা হবে প্রকৃত এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের প্রতিটি ধাপ থাকবে যাচাইযোগ্য। জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক নিরাপত্তার নাম নয়; এটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা।
এই জায়গাতেই জ্বালানি প্রশ্নটি গিয়ে মিশে যায় অর্থনীতির আরেক বড় পরীক্ষায়—এলডিসি উত্তরণে। বাংলাদেশ ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত পথে রয়েছে। এই উত্তরণ নিঃসন্দেহে আমাদের দীর্ঘ উন্নয়নযাত্রার একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু অর্জনের পরের দিনটি যেন অর্জনের চেয়ে কঠিন না হয়, তার প্রস্তুতিও এখন জরুরি। কারণ এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার অনেকটাই একসময় হারাতে হবে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা, বাজার বহুমুখীকরণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি এখন আর বিলাসিতা নয়—অর্থনৈতিক অস্তিত্বের প্রয়োজন। সরকার দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও এ ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
এখানেও সেই একই কথা—প্রতিযোগিতা। এতদিন আমরা অনেক বাজারে বিশেষ সুবিধা পেয়েছি; সামনে আমাদের অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। সস্তা শ্রম দিয়ে চিরকাল বাজার ধরে রাখা যায় না। উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, পণ্যের মান, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্য কূটনীতি—সবকিছুকে একসঙ্গে উন্নত করতে হবে। এলডিসি উত্তরণ তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সনদ পাওয়ার অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য পরীক্ষার নতুন খাতা। এতদিন প্রশ্ন ছিল আমরা কতটা এগিয়েছি; সামনে প্রশ্ন হবে, অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা কতটা টিকে থাকতে পারি।
আজকের সম্পাদকীয় চিন্তাটিও বোধহয় এখানেই। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘কার লোক’ নয়, ‘কাজের লোক’—এই প্রশ্নটি ফিরে আসা দরকার। রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা, প্রশাসনে যোগ্যতা এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা—এই চারটি জিনিস একে অন্যের পরিপূরক। প্রতিযোগিতা না থাকলে রাজনীতি দুর্বল হয়; প্রতিযোগিতা না থাকলে বাজার দুর্বল হয়; যোগ্যতার প্রতিযোগিতা না থাকলে প্রশাসন দুর্বল হয়। আর দুর্বল প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত নাগরিকের ওপরই তার দুর্বলতার বোঝা চাপায়। বস্তুত সুশাসন মানে শুধু দুর্নীতি না করা নয়; এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগটিই সংকুচিত হয়ে আসে।
এদিকে পৃথিবীও যেন আজ একই পাঠ পড়ছে, তবে তার শ্রেণিকক্ষটি অনেক বেশি বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্য—শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে পরাজিত করা যাবে না—যুদ্ধের একটি পুরোনো সত্যকে আবার সামনে এনেছে। আকাশ থেকে বোমা ফেলা সহজ; কিন্তু একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইচ্ছা, সামাজিক কাঠামো, সামরিক সক্ষমতা ও জনগণের মনোবলকে ভেঙে দেওয়া এত সহজ নয়। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকটও দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না; তার অভিঘাত তেলবাজার, সমুদ্রপথ, বীমা, খাদ্যদাম এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এই অস্থিরতার মধ্যেই মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান স্বাক্ষর করেছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে ন্যাটোর Article 5-এর সঙ্গে কারিগরিভাবে তুলনা করেছেন। তবে চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়—এমনটাই স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বলেছে; বাস্তবে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা ঠিক কতটা বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে নামবে, সেটিও এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এই চুক্তিকে বৃহত্তর একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখছেন—যেখানে ইসরায়েল ও ইরানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত পরিসর তৈরি করতে পারে। আবার এটিকে সরাসরি ‘নতুন ইসলামি ন্যাটো’ বলা হয়তো তাড়াহুড়ো হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা-সমীকরণ বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিন বাইরের শক্তির নিরাপত্তা-ছাতার নিচে থাকা দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও নতুন করে ভাবছে। পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য যখন নড়বড়ে হয়, তখন ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির ভিত্তি যত শক্ত, ঝড় সামলানোর ক্ষমতাও তত বেশি।
সপ্তাহের প্রথম সকালে বাংলাদেশের জন্যও কথাটি অপ্রাসঙ্গিক নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাই, জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা চাই, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা চাই, আর প্রশাসনে চাই যোগ্যতার প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা যেন কাউকে ধ্বংস করার অস্ত্র না হয়ে ওঠে; বরং যোগ্যকে সামনে আনার পদ্ধতি হয়। রাষ্ট্রের কাজ কাউকে জেতানো নয়—সবার জন্য এমন একটি মাঠ তৈরি করা, যেখানে যোগ্যতা, সততা ও পরিশ্রমের সুযোগ থাকে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রও এক ধরনের মানুষ—তার চরিত্র আছে, স্মৃতি আছে, দুর্বলতা আছে, এবং উন্নতির আকাঙ্ক্ষাও আছে। তাকে ভালো রাখতে হলে কেবল অর্থনীতি নয়, নৈতিকতাকেও শক্তিশালী করতে হয়। এই নতুন সপ্তাহে তাই আমাদের ছোট্ট প্রার্থনা—রাষ্ট্র যেন কাউকে বিশেষ করে না দেখে, কাউকে অকারণে বঞ্চিতও না করে; দরজা যেন সবার জন্য খোলা থাকে, আর ভেতরে ঢোকার অধিকার নির্ধারিত হয় যোগ্যতায়।
সুপ্রভাত। নতুন সপ্তাহ হোক প্রতিযোগিতার, যোগ্যতার এবং ন্যায়সংগত সুযোগের।

