
দেশ যেন নতুন খাতা খুলেছে আজ, তবে হিসাবের অঙ্কগুলো বড় মজার—একদিকে তিতাস-২৮ কূপ থেকে দিনে ১২–১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে এসে বলছে, “চিন্তা কী?” অন্যদিকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন লিটারে ২০ টাকা করে দাম বাড়ানেরার ফলে রাত থেকেই পকেট নিয়ে চিন্তিত মানুষ। একদিকে বাজারে পে-কমিশনের চাপ, সাথে জুটলো তেলের মূল্যবৃদ্ধি! দেশে দাম বৃদ্ধির দিনেই বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম, ব্যপারটা অনেকটা বিষম খাওয়ার মত! সরকারি ক্রয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার কিছু শর্ত সহজ করার উদ্যোগটিও আশার কথা—দেশে কাজের লোক বাড়ুক, দরপত্রের দরজা একটু খুলুক। তবে দরজা খোলা আর পাহারা তুলে নেওয়া এক কথা নয়; বলতে হচ্ছে, অতিথি যতই সম্মানীয় হোক, ঘরের আলমারির চাবিটা বালিশের নিচেই থাক!
কিন্তু দেশের আরেক প্রান্তে যেন অন্য গল্পের পাতা খুলেছে। সাভারে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ছয়জনের মৃত্যু, ২০ জনের আহত হওয়া; রাজধানীতে ককটেল, আগুন, বোমা উদ্ধার—তারপর কমলাপুরে দাঁড়িয়ে থাকা হাওড় এক্সপ্রেসের বগিতে আগুন। রেলওয়ে পুলিশের ধারণা, সেটি দুর্ঘটনা নয়, নাশকতার অংশ। কথাটা সত্যি কি না তদন্ত বলবে; কিন্তু আগুনের একটা স্বভাব আছে—সে রাজনীতি বোঝে না, মতবাদ বোঝে না, শুধু মানুষ আর কাঠামো পুড়িয়ে দেয়। আর কুমিল্লার অপ্রতিম—একটি আইফোনের জন্য যে কিশোরটির জীবন চলে গেল—সে তো আরও বড় প্রশ্ন রেখে গেল। প্রযুক্তি আমাদের হাতে যত স্মার্ট হচ্ছে, মানুষটি কি ততটাই মানুষ থাকছে? ফেসবুকে ক্ষোভ উঠেছে, ভিডিও ছড়িয়েছে, মন্তব্যের বন্যা বইছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় গুণ যেমন তার গতি, সবচেয়ে বড় বিপদও বোধ হয় সেটিই—বিচারের আগে রায় দিয়ে ফেলা।
রাজধানীর একটি মসজিদ থেকে ২৩ জনকে আটকের পর একটি গোপন সংগঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে তারাই আবার বলেছে, এখনই একে উগ্রবাদের উত্থান বলার মতো তথ্য নেই। এই দ্বিতীয় বাক্যটি প্রথমটির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রের চোখ খোলা থাকা দরকার, কিন্তু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে প্রতিটি ছায়াকে মানুষ ভাবাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সম্পাদকীয় পাতাগুলোও আজ নানা ছোট দরজা দিয়ে একই ঘরে ঢোকে—রাস্তার দুর্ভোগ, নাগরিক সুবিধার অভাব, কৃষকের স্বার্থ, নিরাপত্তা। সভ্যতার পরীক্ষা আসলে এখানেই: আমরা কত বড় সেতু বানালাম, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—সেই সেতু পার হয়ে মানুষটি নিরাপদে বাড়ি ফিরল কি না। রাষ্ট্রের সৌন্দর্যও বোধ হয় প্রাসাদের চূড়ায় নয়, সাধারণ মানুষের নিশ্চিন্ত সন্ধ্যায়।
এদিকে বাংলাদেশের দৃষ্টি একটু দূরে—নিউইয়র্কে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে ঢাকা ছেড়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; এটি তাঁর প্রথম বিশ্বমঞ্চের ভাষণ, যেখানে রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় উঠে আসার কথা। জাতিসংঘে বিশ্বনেতারা যুদ্ধ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে বড় বড় কথা বলবেন। আমরা এখান থেকে শুনব, বিশ্লেষণ করব, তারপর বাজারে যাব। পৃথিবীর কূটনীতি বিলিয়নে হিসাব করে, রাষ্ট্র ঘনফুটে, সরকার লিটারে—আর মানুষ হিসাব করে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত পকেটে কত থাকে। শেষ পর্যন্ত সভ্যতার সমস্ত জাঁকজমক সরিয়ে দিলে মানুষের চাওয়া বড় বেশি সাধারণ: নিরাপদে বাঁচতে চায়, ন্যায্য দামে বাঁচতে চায়, আর রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে চায়। কেউ নিশ্চয়ই মুচকি হেসে বলছেন—“দেশটা বড় জটিল নয়; আমরা-ই মাঝে মাঝে তাকে জটিল করে ফেলি।”

