
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশিসহ সব বিদেশি কর্মীর জন্য এক বড় দুঃসংবাদ এসেছে। দেশটির সরকার বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে এক কঠোর নীতি ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী ১ জুন থেকে বিদেশি কর্মীদের ‘এমপ্লয়মেন্ট পাস’ বা কাজের অনুমতির জন্য ন্যূনতম বেতন সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটিতে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মালয়েশিয়া সরকারের ২০২৫ সালের জাতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির ১৪ শতাংশের বেশি বিদেশি কর্মী রয়েছে। সরকার এই হার ২০৩৫ সালের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মূলত স্থানীয় নাগরিকদের উচ্চ বেতনে চাকরির সুযোগ করে দিতেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এতে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বৈধ ৮ লাখ বাংলাদেশির পাশাপাশি কয়েক লাখ অবৈধ কর্মীর দেশটিতে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নতুন নিয়মে বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমতির জন্য বেতন সীমা এমনভাবে বাড়ানো হয়েছে, যা অনেক কোম্পানির পক্ষেই প্রদান করা কঠিন হবে। এর ফলে নিয়োগকর্তারা বিদেশি কর্মীদের পরিবর্তে স্থানীয়দের নিয়োগ দিতে বাধ্য হবেন।
এই নিয়মে মূলত তিনটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে বিদেশি পেশাজীবীদের। ক্যাটাগরি-১-এর ক্ষেত্রে এখন থেকে ন্যূনতম মাসিক বেতন হতে হবে ২০ হাজার রিঙ্গিত, যা আগে ছিল ১০ হাজার রিঙ্গিত। এই উচ্চ বেতনভোগী কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ বছর দেশটিতে অবস্থানের অনুমতি পাবেন।
অন্যদিকে, ক্যাটাগরি-২-এর ক্ষেত্রে বেতনসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার থেকে ১৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত পর্যন্ত। এই স্তরের কর্মীদের জন্যও ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ রাখা হয়েছে ১০ বছর।
তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে ক্যাটাগরি-৩-এর ওপর, যেখানে আগে ৫ হাজার রিঙ্গিত বেতন হলেই চলত, এখন সেখানে নতুন সীমা ধরা হয়েছে ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত পর্যন্ত। এই ক্যাটাগরির কর্মীদের জন্য অবস্থানের সময়সীমা কমিয়ে মাত্র ৫ বছর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট এই সময় পার হওয়ার পর নিয়োগকর্তাদের বাধ্যতামূলকভাবে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা থাকতে হবে।
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ শ্রমিকের পাশাপাশি বাংলাদেশি পেশাজীবীরাও বড় ধরনের সংকটে পড়বেন। ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের ভিসা এমনিতেই বন্ধ রয়েছে। নতুন নীতি কার্যকর হলে যারা বর্তমানে সেখানে আছেন, তাদের একটি বড় অংশকে মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসতে হবে। কারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো (এসএমই) বিদেশি কর্মীদের জন্য এই উচ্চ বেতন বহন করতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের চতুর্থ শীর্ষ দেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে থাকা প্রবাসীরা ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বিপুল সংখ্যক কর্মী কাজ হারিয়ে দেশে ফিরলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসায় বাংলাদেশ সরকারকে এখনই বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায়, ২০৩৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মহীন হয়ে পড়ার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হবে।
আমার বার্তা/জেএইচ

