ই-পেপার শুক্রবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২

ইসলামের নবজাগরণের পথিকৃৎ ইমাম গাজ্জালি (রহ.)

আহমাদ সাব্বির
০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:০১

একাদশ শতাব্দী ছিল ইসলামি ইতিহাসের এক গভীর সংকটময় অধ্যায়। বাহ্যিকভাবে মুসলিম বিশ্ব তখন সাম্রাজ্যিক বিস্তারে সমৃদ্ধ, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনে অগ্রসর; কিন্তু অন্তর্গতভাবে ধর্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও আত্মিক দৃঢ়তায় ভাঙনের মুখে। একদিকে ইউরোপীয় খ্রিস্টান শক্তির ক্রুসেড মুসলিম রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে নানা দর্শন, মতবাদ, গ্রিক ও ভারতীয় দার্শনিক প্রভাব এবং নব্য মুসলিমদের অনৈসলামিক আচার ইসলামের মৌল বিশ্বাসকে দুর্বল করে তুলেছিল। এই যুগসন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হন এমন এক মহামনীষী, যিনি যুক্তি, সাধনা ও আত্মিক উপলব্ধির সমন্বয়ে ইসলামকে নতুন প্রাণে সঞ্জীবিত করেন—তিনি ইমাম আবু হামিদ মুহাম্মদ আল-গাজ্জালি, ইতিহাসে যিনি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ উপাধিতে পরিচিত।

১০৫৮ খ্রিস্টাব্দে খুরাসানের তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন ইমাম গাজ্জালি (রহ.)। তার পিতা ছিলেন গভীর ধর্মভীরু মানুষ। আল্লাহর কাছে তিনি দোয়া করতেন যেন তার সন্তানরা দ্বীনের খাদেম হয়। এই পবিত্র আকাঙ্ক্ষারই বাস্তব রূপ হয়ে ওঠেন ইমাম গাজ্জালি। শৈশবেই তিনি কোরআন, হাদিস ও প্রাথমিক ইসলামি জ্ঞান অর্জন করেন এবং অল্প বয়সেই তার অসাধারণ মেধা ও অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায়।

তার শিক্ষা জীবন ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। নিশাপুরের বিখ্যাত নিযামিয়া মাদ্রাসায় তিনি ইমামুল হারামাইন আবদুল মা‘আলীর কাছে ফিকহ, কালাম, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও প্রকৃতিবিজ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিশ্লেষণক্ষমতা শিক্ষকদের বিস্মিত করে। গাজ্জালির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে সমালোচনামূলক চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা। তিনি বিশ্বাস করতেন, যাচাই ও বিশ্লেষণ ছাড়া প্রকৃত জ্ঞান সম্ভব নয়। এই মানসিকতা থেকেই তিনি সব দর্শন, সব মতবাদ, এমনকি নাস্তিকতা ও বাতেনিবাদ পর্যন্ত গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।

সেলজুক শাসক মালিক শাহের উজির নিজামুল মুলকের পৃষ্ঠপোষকতায় মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসার প্রধান অধ্যাপক নিযুক্ত হন। একজন শ্রেষ্ঠ তার্কিক ও পণ্ডিত হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এই সময় তিনি জ্ঞান, সম্মান, অর্থ ও ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেন। তার বক্তৃতা, ফতোয়া ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে গোটা বাগদাদ মুগ্ধ হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই চরম সাফল্যের মাঝেই তার জীবনে ঘটে এক অভূতপূর্ব আত্মিক সংকট। অন্তরের গভীরে তিনি অনুভব করেন—এই জ্ঞান, খ্যাতি ও ক্ষমতা তাকে প্রকৃত সত্যের কাছাকাছি নিচ্ছে না। যুক্তিবাদ তাকে তৃপ্ত করতে ব্যর্থ হয়; বরং তাকে এক ধরনের শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়। দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণার পর ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সবকিছু ত্যাগ করে নিঃসঙ্গ সত্যসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। এই ত্যাগ ছিল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা।

পরবর্তী প্রায় দশ বছর তিনি দরবেশের মতো সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জেরুজালেম, মিসর ও হেজাজে ঘুরে বেড়ান। মসজিদে ইবাদত, নির্জন সাধনা ও সূফী দরবেশদের সাহচর্যে তিনি উপলব্ধি করেন—যুক্তির অতীত এক সত্য আছে, যা হৃদয়ের আলোয় ধরা দেয়। তিনি বলেন, যুক্তি মানুষকে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু আল্লাহপ্রাপ্তির শেষ দরজা খুলে দেয় কেবল ঐশী নুর।

এই আত্মিক অভিজ্ঞতার ফলেই ইমাম গাজ্জালির চিন্তায় এক অনন্য সমন্বয় ঘটে—শরিয়ত, দর্শন ও তাসাউফের। তিনি উপলব্ধি করেন, ধর্ম যদি কেবল বাহ্যিক বিধিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শুষ্ক হয়ে পড়ে; আর মরমীবাদ যদি শরিয়তবিচ্যুত হয়, তবে তা বিপথগামী হয়। গাজ্জালির মহত্ত্ব এখানেই—তিনি শরিয়ত ও মারেফত, যুক্তি ও প্রেম, জ্ঞান ও সাধনাকে এক সুতোয় গেঁথে দেন।

এই উপলব্ধির শ্রেষ্ঠ ফসল তার অমর গ্রন্থ ‘ইহইয়াউ উলূমুদ্দীন’—দ্বীনি জ্ঞানের পুনর্জাগরণ। চার খণ্ডে রচিত এই গ্রন্থে তিনি ইবাদত, আচার, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা উপস্থাপন করেন। এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলা হয়েছে—ইসলামি চিন্তার সব গ্রন্থ হারিয়ে গেলেও ‘ইহইয়া’ থাকলে ইসলাম বেঁচে থাকবে।

এ ছাড়া ‘তহাফাতুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে তিনি দর্শনের অসংগতিগুলো চিহ্নিত করেন, তবে দর্শনকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। বরং যুক্তিকে সীমার মধ্যে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার অন্যান্য গ্রন্থ—‘আল-মুনকিয মিনাদ দালাল’, ‘মিশকাতুল আনওয়ার’, ‘মুকাশাফাতুল কুলুব’—সবই আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবমুক্তির পথ নির্দেশ করে।

ইমাম গাজ্জালির সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো সুফিবাদকে ইসলামের মূলধারায় প্রতিষ্ঠা করা। তার আগে তাসাউফকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হতো। কিন্তু গাজ্জালির হাতে তা কোরআন ও সুন্নাহর আলোয় বৈধতা ও মর্যাদা লাভ করে। ফলে আলেম ও সুফির মধ্যে বিভেদ কমে আসে এবং ইসলামের অভ্যন্তরীণ সংহতি দৃঢ় হয়। এর প্রভাব পড়ে আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তারে।

তার প্রভাব শুধু মুসলিম বিশ্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না। খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক সেন্ট টমাস আকুইনাস, দান্তে, এমনকি পরবর্তী কালের দার্শনিক ব্লেইজ প্যাসকাল পর্যন্ত গাজ্জালির চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হন। যুক্তি ও বিশ্বাসের সমন্বয়ে ধর্মের যে সমাধান গাজ্জালি দেখিয়েছিলেন, তা বিশ্বদর্শনের ইতিহাসে অনন্য।

১১০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য আবার শিক্ষাদানে ফিরে গেলেও শেষ পর্যন্ত জন্মভূমি তুসে স্থায়ী হন। সেখানে একটি মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় জীবন অতিবাহিত করেন। ১১১১ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগমুহূর্তে তার প্রশান্তি ও আল্লাহপ্রেম ছিল তার জীবনদর্শনেরই পরিপূর্ণতা।

ইমাম গাজ্জালি ছিলেন কেবল একজন পণ্ডিত নন—তিনি ছিলেন আত্মার চিকিৎসক, সমাজসংস্কারক ও মানবতার শিক্ষক। নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহপ্রেমকে জ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করাই ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা। তাই শতাব্দী পেরিয়েও তিনি জীবিত—চিন্তায়, আদর্শে ও মানবমুক্তির আহ্বানে।

আরব আমিরাতে সব মসজিদে একই সময়ে জুমা আদায়ের নির্দেশ

দুবাইসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের সব মসজিদে আগামীকাল শুক্রবার থেকে জুমার খুতবা ও নামাজের

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আলেমদের পিএইচডি স্কলারশিপ দেওয়া হবে: ধর্ম উপদেষ্টা

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আলেমদের পিএইচডি স্কলারশিপ দেওয়া হবেইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আলেমদের পিএইচডি স্কলারশিপ দেওয়া হবে

২০২৬ সালের শবে বরাত, রমজান, শবে কদর ও ঈদ কবে?

২০২৬ সালে শবে বরাত, রমজান, শবে কদর ও ঈদের মতো ধর্মীয় বিধান পালন করতে হবে

জানাজায় বিপুল জনসমাগম মৃতের জন্য যে সৌভাগ্য বয়ে আনে

এক হাদিসে রাসুল (সা.) হজরত আলী (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘হে আলী! তিনটি জিনিসের ক্ষেত্রে
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

জনগণের কাছে আ. লীগের গ্রহণযোগ্যতা নেই: প্রেস সচিব

মডেল মেঘনা পেশায় রাজনৈতিক প্রশিক্ষক, আছে ২৯ লাখ টাকার সম্পদ

সম্পর্ক জোরদারে বৈঠকের সিদ্ধান্ত চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার

পল্লবীতে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেফতার ৩

কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ৩০০ মণ লবণসহ ডুবে গেল নৌকা

খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বায়তুল মোকাররমে বিশেষ দোয়া

আমি আমার মতো করেই রাজনীতি চালিয়ে যাব: রুমিন ফারহানা

নিজের রাইফেলের গুলিতে বিজিবি সদস্যের আত্মহত্যা

খালেদা জিয়ার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করতে হবে: আমীর খসরু

এক এনআইডির বিপরীতে অনেকগুলো মোবাইল, আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ

কুমিল্লা-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল

নির্বাচনি ট্রেনে বিএনপির ১০ নারী প্রার্থী, জামায়াতের কত?

মারা গেছেন ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া

ঘন কুয়াশা, ঢাকার ৯ ফ্লাইট নামল চট্টগ্রাম কলকাতা ব্যাংককে

বছরের প্রথম দিন মস্কোতে টানা ৬ ঘণ্টা ড্রোন হামলা ইউক্রেনের

চট্টগ্রাম-১ আসনের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল

ঘরের মাঠে হোঁচট খেল লিভারপুল

শীত মোকাবিলায় যন্ত্রপাতির চাহিদা বাড়ছে, বিক্রি ঊর্ধ্বমুখী

ইসলামের নবজাগরণের পথিকৃৎ ইমাম গাজ্জালি (রহ.)