
এক লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা লভ্যাংশ। এমন লভ্যাংশ দেওয়ার অফার যে কেউ নিতে চাইবেন। শুধু তাই! লাভসহ আসলের সমপরিমাণ অর্থ ফেরত এবং ৩৩ মাসে বিনিয়োগকৃত মূলধন দ্বিগুণ হবে বলেও প্রচারণা চালায় ‘নাজরান ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো প্রজেক্ট’ নামে একটি ভুয়া প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতারক চক্র।
চক্রের সদস্যদের প্রতিশ্রুতি আর প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে তিন বান্ধবীসহ ২০২৩ সালের মে মাসে ভাটারা থানা (ডিএমপি) এলাকার কুড়িল চৌরাস্তা সংলগ্ন ‘নাজরান ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো প্রজেক্ট’ প্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে বিনিয়োগ করেন এক ভুক্তভোগী।
নিজে ৭ লাখ টাকা এবং অন্য দুই বান্ধবী প্রত্যেকেই ৫ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে চক্রের সদস্যরা তাদের মানি রিসিট ও মাসিক ক্যাশ ব্যাক বহি প্রদান করে। প্রথম দিকে আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে চক্রটির সদস্যরা মোট ৪২ হাজার টাকা ফেরত দেয়। ভুক্তভোগীদের আস্থা বৃদ্ধি পেতেই আরেক প্রতারণার ফাঁদ। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন।
পরবর্তীতে প্রতারক চক্রের সদস্যরা বিনিয়োগকারীদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রজেক্টের প্লট ক্রয়ের কথা বলে বাদীর ও অন্য দুই বান্ধবীর কাছ থেকে এক কোটি ৬৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা বিনিয়োগের নামে প্রতিষ্ঠানে জমা করতে বাধ্য করে। জমাকৃত অর্থের লভ্যাংশ হিসেবে ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা ফেরত দিলেও পরবর্তীতে লেনদেন স্থগিত এবং অফিস বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে শুধু এই চার ভিকটিমই নন, অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে নাজরান ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো নামের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রতারক সদস্যরা।
এ ঘটনায় দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা প্রজেক্টে জড়িত মো. ওবায়েদুল্লাহ (৩৩) একজনকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তিনি ভোলার শশীভোষণ থানার জাহানপুর এলাকার মৃত আবু নাইমের ছেলে।
রাজধানীর সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রো-উত্তর ইউনিটের একটি দল।
মঙ্গলবার (৫ মে) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, মামলাটি তদন্তকালে জানা যায়, প্রতারক চক্র একই কৌশলে অসংখ্য ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। ‘নাজরান ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো প্রজেক্ট’ প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ৪টি ব্যাংক হিসাব, মানি রিসিট পর্যালোচনা এবং অফিসের সার্ভারে থাকা তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন ভুক্তভোগী কর্তৃক আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, মামলা দায়েরের পরপরই অভিযুক্তরা পালিয়ে যান এবং গ্রেপ্তার এড়াতে ওবায়েদুল্লাহ তার ব্যবহৃত সব মোবাইল নম্বর বন্ধ রাখেন। পরবর্তীতে গোয়েন্দা ও প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যের প্রাযুক্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়াও গ্রেপ্তার অভিযুক্ত ওবায়েদুল্লাহ’র ব্যক্তিগত ১৪টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিগত ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার জন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন ও মানব বন্ধন করেন ভুক্তভোগীরা। এ ব্যাপারে সিআইডি আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানান জসীম উদ্দিন খান।
তদন্তকালে গ্রেপ্তার ওবায়েদুল্লাহ’র বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনটিই সিআর মামলা। মামলাগুলোতে আদালত কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলার এজাহারে উল্লিখিত অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা সে সংক্রান্ত তথ্যাদির জন্য গ্রেপ্তারকৃতকে পুলিশ প্রহরায় সতর্কতার সঙ্গে রিমান্ডের আবেদনসহ বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান।
সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করছে সিআইডি। পাশাপাশি অচেনা ব্যক্তি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সত্যতা যাচাই না করে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
আমার বার্তা/এমই

