
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ, বন্দর অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যস্ফীতির চাপে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ইরান। দেশটির লাখো মানুষ জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন। চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদেরও এখন পড়াশোনা বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কহীন যেকোনো কাজের সন্ধান করতে হচ্ছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তেহরানের ২৬ বছর বয়সী সাঈদ নামের এক বাসিন্দা জানান, তিনি ফারসি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চেয়ে ভালো বেতনের চাকরি খুঁজছেন। তবে চাকরির বাজারে বেতন কম, কাজের সময় দীর্ঘ এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য বীমা সুবিধাও নেই।
সাঈদের ভাষ্য, অনেক প্রতিষ্ঠান দিনে ১২ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ছয় দিন কাজের দাবি করছে। বিভিন্ন অজুহাতে বেতন কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কারণ, কর্মীদের সামনে বিকল্প খুবই সীমিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে শিক্ষক, ক্যাশিয়ার ও বিক্রয়কর্মীদের মাসিক আয় ২০০ মিলিয়ন রিয়ালেরও কম। অনেক ক্ষেত্রে এই আয় দেশটির নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে।
ন্যূনতম মজুরি ও সরকারি সহায়তা পাওয়া একজন শ্রমিকের জন্য এক কেজি খাসির মাংস কিনতেই মাসিক আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। ১০ কেজি ইরানি চাল কিনতে খরচ হচ্ছে মাসিক আয়ের এক-পঞ্চমাংশের বেশি। এর সঙ্গে বাড়তি বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-পানি, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়ও রয়েছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ১২৮ শতাংশ। এর মধ্যে তেল ও চর্বিজাতীয় পণ্যের দাম এক বছরে ২৬১ শতাংশ, দুধ, পনির ও ডিমের দাম ১৪৭ শতাংশ এবং মাংস ও পোলট্রির দাম ১৪৫ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছরের বসন্তে ইরানে তরুণদের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৪ শতাংশে, যা এক বছরের ব্যবধানে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ১ শতাংশ হলেও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৪০ শতাংশ। ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়মিত কাজে যুক্ত রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। উত্তর ইরানের লাহিজানের এক মুদি ব্যবসায়ী ইয়াশার জানান, নিজেদের বাড়ি ও দুটি দোকান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের আয় দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দোকানে ক্রেতা কমে যাওয়ায় পরবর্তী চালান কেনার অর্থও অনেক সময় জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধ ও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ সরকারের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে তেল বিক্রি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কিছু কারখানা ধ্বংস হওয়ায় সরকারের কর আদায়ও কমেছে।
এদিকে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে পেট্রলের দাম আরও বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে পেজেশকিয়ান সরকার। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্ধারিত মাসিক জ্বালানি কোটা আরও কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে অতীতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হওয়ায় সরকার এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন পেজেশকিয়ানসহ ইরানের কয়েকজন শীর্ষ নেতা। ওমান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা চললেও স্বল্পমেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো স্পষ্ট নয়।
আমার বার্তা/এমই

