
বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য অবকাঠামোয় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে এই বন্দরটি চালু হলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার বিশাল কনটেইনারবাহী মাদার ভেসেল এবং ১ লাখ ডেডওয়েট টনের মালবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ বার্থিংয়ের এই অনন্য সুযোগ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ তথ্য জানান।
নৌ-পরিবহনমন্ত্রী জানান, মাতারবাড়ী বন্দরটি চালু হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং প্রায় ১ লাখ ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার মালবাহী জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারবে। বর্তমানে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে প্রয়োজনীয় গভীরতা না থাকায় বড় মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি আসতে পারে না। এর ফলে আমদানিকারকদের সিঙ্গাপুর, কলম্বো, মালয়েশিয়াসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে পণ্য খালাস করে ছোট ফিডার ভেসেলে করে বাংলাদেশে আনার কারণে প্রতি চালানে অতিরিক্ত ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যয় ও পরিবহন সময় বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সংসদকে মন্ত্রী জানান, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রায় ১৬ মিটার গভীরতার একটি নৌ-চ্যানেল এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এই বন্দরটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে আগত জাহাজের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি বার্থিং নিতে পারবে। এতে বিদেশি বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা কমার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রম আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও দক্ষ হবে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কেবল দেশের বাণিজ্যের সক্ষমতাই বাড়াবে না, এটি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে গড়ে উঠবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রানজিটেও বড় ভূমিকা রাখবে।
মাতারবাড়ী প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন নৌমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরাসরি শিপিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস ও ডেলিভারি কার্যক্রমের ৮০ শতাংশ ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা এবং নতুন বে-টার্মিনাল নির্মাণের কাজও উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে চলছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, কর্ণফুলী চ্যানেলের বর্তমান গভীরতা ৮.৫ থেকে ১০ মিটার এবং এটি জোয়ার-ভাটানির্ভর হওয়ায় বর্তমানে সর্বোচ্চ ১০ মিটার গভীরতার এবং গড়ে প্রায় ৩ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে। তবে বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি চালু হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, যা জাহাজের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনবে। এছাড়া বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং স্বল্প সময়ে কম খরচে পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে বেসরকারি আইসিডির মাধ্যমে কনটেইনার ডেলিভারি জোরদার করা, বন্দরে পড়ে থাকা ১০ হাজারের বেশি টিইইউ কনটেইনার কাস্টমসের মাধ্যমে নিলামে নিষ্পত্তি করা এবং জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই পণ্য ছাড়করণের জন্য প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।
আমার বার্তা/এমই

