
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা আবারও ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশজুড়ে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ না নিলেও ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও অন্যান্য জনপ্রিয় দলের সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে দেশ। এই আবেগই প্রমাণ করে, ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে এখনও বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দল ছিল বাংলাদেশ। জাতীয় স্টেডিয়াম এবং ঢাকার ক্লাব ফুটবলে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। বিশেষ করে আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ ছিল কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে এক উৎসব। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় পরিকল্পনার ঘাটতি, তৃণমূল পর্যায়ে অবহেলা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের ফুটবল সেই গৌরবময় অবস্থান হারিয়ে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ফুটবলে আবারও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে হামজা চৌধুরীর জাতীয় দলে যোগদান শুধু একটি নতুন ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি নয়; এটি পুরো দেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে নতুন আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেছে। দেশের তরুণ ফুটবলাররা এখন বুঝতে পারছে, আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল খেলা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ পেলে বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের ফুটবলার উঠে আসতে পারে।
হামজা চৌধুরীর আগমনের পর গ্যালারিতে দর্শক বেড়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল নিয়ে আলোচনা বেড়েছে, তরুণদের আগ্রহ নতুন করে জেগেছে। এই ইতিবাচক আবহকে কাজে লাগাতে না পারলে সেটি ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস হিসেবেই থেকে যাবে। তাই এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ।
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর ভুটানের কাছে ৩-১ গোলের পরাজয় ছিল এক কালো অধ্যায়। সেই ম্যাচের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তলানিতে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল ফুটবলাররা। কিন্তু পরে জেমি ডের অধীনে জাতীয় দল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
বাংলাদেশে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে জেমি ডে বলেছিলেন, বাংলাদেশে কাজ করার সময় তিনি ফুটবলারদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছেন। তার মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল মানসিকতায়। তিনি খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন যে বাংলাদেশও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমানতালে ৯০ মিনিট লড়াই করতে পারে। আজ জাতীয় দলের লড়াকু মনোভাবের পেছনে সেই মানসিক পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
জেমি ডে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছিলেন। তার মতে, একটি দেশের ফুটবলের উন্নতি করতে হলে প্রথমে ক্লাব ফুটবলকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লিগের মাত্র কয়েকটি ক্লাবের মধ্যে তিনি প্রকৃত পেশাদারিত্ব দেখেছিলেন। বিশেষ করে বসুন্ধরা কিংসের অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ও নিজস্ব একাডেমির প্রশংসা করেছিলেন তিনি। তার বক্তব্য ছিল পরিষ্কার—দেশের প্রতিটি পেশাদার ক্লাবের নিজস্ব একাডেমি থাকতে হবে, সেখান থেকেই ভবিষ্যতের জাতীয় দলের ফুটবলার তৈরি হবে।
এই কথাগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় সংকট তৃণমূল পর্যায়ে। দেশের শত শত প্রতিভাবান কিশোর শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক জেলায় সারা বছর কোনো প্রতিযোগিতাই হয় না। কোথাও ভালো কোচ নেই, কোথাও মাঠ নেই, কোথাও আবার প্রশিক্ষণের ন্যূনতম সুবিধাও নেই।
অথচ উন্নত ফুটবল খেলতে হলে প্রতিভা খুঁজে বের করার কাজ শুরু করতে হবে গ্রাম, উপজেলা এবং জেলা থেকেই। প্রতিটি জেলায় ফুটবল একাডেমি, নিয়মিত বয়সভিত্তিক লিগ এবং দক্ষ কোচ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সারা বছর ফুটবল প্রতিযোগিতা চালু করলে হাজার হাজার নতুন প্রতিভা উঠে আসবে।
একই সঙ্গে জেলা ও বিভাগীয় লিগকে পুনর্জীবিত করা জরুরি। ঘরোয়া ফুটবল শক্তিশালী না হলে জাতীয় দল কখনোই ধারাবাহিক সাফল্য পাবে না। বর্তমানে অনেক জেলা লিগ অনিয়মিত, কোথাও আবার বছরের পর বছর বন্ধ। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি জেলায় নিয়মিত লিগ আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।
ক্লাবগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নও সময়ের দাবি। এখনও দেশের অধিকাংশ ক্লাবের নিজস্ব অনুশীলন মাঠ নেই। আধুনিক জিমনেশিয়াম, মেডিকেল সেন্টার, ভিডিও অ্যানালাইসিস রুম কিংবা স্পোর্টস সায়েন্স সুবিধা অনেক ক্লাবেই অনুপস্থিত। অথচ আন্তর্জাতিক ফুটবলে এগুলো এখন মৌলিক প্রয়োজন।
প্রতিটি পেশাদার ক্লাবের জন্য নিজস্ব মাঠ, একাডেমি এবং যুব উন্নয়ন কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকার এবং বাফুফা যৌথভাবে জেলা পর্যায়ে আধুনিক অনুশীলন কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে। এতে শুধু জাতীয় দলের নয়, পুরো দেশের ফুটবল কাঠামো শক্তিশালী হবে।
ফুটবল উন্নয়নে অর্থের অভাবই একমাত্র সমস্যা নয়; বরং অর্থের সঠিক ব্যবহারও বড় প্রশ্ন। সরকারি বরাদ্দ, ফিফা ও এএফসির উন্নয়ন তহবিল এবং কর্পোরেট বিনিয়োগের প্রতিটি টাকার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের নিয়মিত অডিট এবং প্রকাশ্য প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। ক্রিকেটের মতো ফুটবলও একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, ক্লাব ব্র্যান্ডিং এবং যুব টুর্নামেন্টে কর্পোরেট অংশগ্রহণ ফুটবলের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করবে।
কোচ এবং রেফারি উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের লাইসেন্সধারী কোচ তৈরি না হলে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলারও তৈরি হবে না। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজের সুযোগ, স্পোর্টস সায়েন্স, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং আধুনিক ফিটনেস ব্যবস্থাকে ফুটবলের অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন আশার আরেকটি বড় অধ্যায় হলো সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সাফল্য। সান মারিনোর বিপক্ষে জয় হয়তো বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিকে হারানোর মতো ঘটনা নয়, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয়ের ধারাবাহিকতা তৈরি হলে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়বে, তেমনি ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে অভিজ্ঞ বিদেশি কোচদের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের ফুটবলে আধুনিক কৌশল, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। থমাস ডুলির মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোচদের দর্শন মূলত শৃঙ্খলা, ট্যাকটিক্যাল ফুটবল এবং দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড় তৈরির ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশকেও কোচ বদলের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বিশ্বাস রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফেডারেশন, সরকার, ক্লাব, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সমর্থকদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। শুধু জাতীয় দলের একটি-দুটি ভালো ফল দিয়ে ফুটবলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে উঠবে তৃণমূলে, একাডেমিতে, স্কুল ফুটবলে এবং শক্তিশালী ঘরোয়া লিগে।
বাংলাদেশের ফুটবল আজ আর শুধু অতীতের গৌরব ফেরানোর লড়াই নয়; এটি নতুন এক যাত্রার সূচনা। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হামজা চৌধুরীর জাতীয় দলে যোগদান দেশের ফুটবলে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে। তার আগমন শুধু জাতীয় দলের শক্তিই বাড়ায়নি, দেশের তরুণ ফুটবলারদের স্বপ্ন দেখার সাহসও বাড়িয়েছে। স্টেডিয়ামে দর্শকের উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল নিয়ে আগ্রহ এবং স্পনসরদের আগ্রহ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
এই নতুন যাত্রায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন অভিজ্ঞ জার্মান-আমেরিকান কোচ থমাস ডুলির হাতে জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং ফিলিপাইনের ফুটবলে ঐতিহাসিক সাফল্যের রূপকার ডুলির মূল দর্শন হলো দীর্ঘমেয়াদি দল গঠন, শৃঙ্খলা, আধুনিক কৌশল এবং তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরি করা। তিনি দায়িত্ব নিয়েই স্পষ্ট করে বলেছেন, রাতারাতি সাফল্য নয়; পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।
ডুলির অধীনে সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ও ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রতিপক্ষ বিশ্ব ফুটবলের শক্তিধর দল না হলেও আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় সবসময়ই ইতিবাচক বার্তা দেয়। এই সাফল্য দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক কোচিং এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে বাংলাদেশ ধারাবাহিক উন্নতির পথে এগোতে পারে। তবে একটি বা দুটি জয়কে চূড়ান্ত সাফল্য মনে করলে চলবে না; বরং এটিকে ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
হামজা চৌধুরীর মতো আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলারের উপস্থিতি, থমাস ডুলির মতো অভিজ্ঞ কোচের নেতৃত্ব এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সাফল্য—এই তিনটি বিষয় বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এই ইতিবাচক আবহকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি জেলায় ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত জেলা ও বিভাগীয় লিগ আয়োজন, ক্লাবগুলোর নিজস্ব মাঠ ও একাডেমি নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ফুটবল প্রশাসন গড়ে তোলা। তাহলেই আজকের আশার আলো আগামী দিনের স্থায়ী সাফল্যে রূপ নেবে।
লেখক : অনলাইন ইনচার্জ, আমার বার্তা।
আমার বার্তা/মোহাম্মদ ইয়ামিন/সিআর/এমই

