
একটি উন্নত সমাজ, সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং সুস্থ-সবল প্রজন্মের স্বপ্ন আমাদের সবার। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো এর সচেতন জনবল, বিশেষ করে তরুণ সমাজ। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিষফোঁড়া বা অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মাদক’। মাদক কেবল একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে এবং পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মাদক তথা নেশাজাতীয় দ্রব্যের আগ্রাসন এখন মরণব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নারী-পুরুষ, যুবসমাজ থেকে শুরু করে স্কুলের কিশোর-কিশোরীরাও আজ এই বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
একটা সময় আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা ছিল যে, মাদক কেবল শহরের উচ্চবিত্ত বা অবক্ষয়গ্রস্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। শহর ছাড়িয়ে মাদকের নীল দংশন এখন গ্রামের নিভৃত পল্লিতেও পৌঁছে গেছে। গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটলে এখন প্রায়ই শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য চোখে পড়ে। গাছের আড়ালে, ঝোপঝাড়ের পাশে বা নির্জন কালভার্টের ওপর কিশোর-যুবকরা জটলা পাকিয়ে নেশা করছে। আগে শহরে নির্দিষ্ট কিছু ‘স্পট’ ছিল যেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যেত, এখন সেই একই দৃশ্য গ্রামের আনাচে-কানাচেও দৃশ্যমান।
শহরের তুলনায় গ্রামে মাদকসেবীরা অনেকটা ‘নিরাপদ’ বোধ করে। এর কারণ হলো গ্রামে পুলিশের টহল কম এবং সামাজিক শাসনের চিরায়ত কাঠামো আজ সেখানে ভেঙে পড়েছে। কোনো সচেতন মানুষ যদি এদের বাধা দিতে যায়, তবে উল্টো বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রধান কারণ হলো এই মাদকসেবী যুবকদের সাথে স্থানীয় ‘কিশোর গ্যাং’ এবং প্রভাবশালী মহলের অশুভ যোগসূত্র। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব অপরাধী চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না, যা প্রকারান্তরে মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য এক অভয়রাণ্য তৈরি করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে মূলত কোনো মাদক উৎপাদন হয় না। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ মাদক দেশে প্রবেশ করে। সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু অসাধু লোক এই পাচারকার্যের সাথে সরাসরি জড়িত। তবে মাদক ব্যবসার মূল হোতা বা ‘গডফাদার’রা বাস করে ঢাকা বা বড় বড় শহরগুলোতে। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে। মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে নারী ও শিশুদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে, কারণ তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ও পুলিশের সন্দেহ কম থাকে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যও এই ব্যবসার সাথে জড়িত থাকে। পরিবহনের সময় মাঝে মাঝে চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও মূল মালিকরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় এবং টাকার জোরে অপরাধীদের দ্রুত জামিন করিয়ে নেয়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি মাদকের শিকড়কে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা খুব সহজেই প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে যায়, আর সেই অর্থের জোরে তারা নতুন নতুন বাজার ও নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
বর্তমানে দেশে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, কোকেন, আফিম এবং অতি সম্প্রতি ‘আইস’ বা ব্রাউন সুগারের মতো মারাত্মক সব মাদক পাওয়া যাচ্ছে। এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের ফলে একজন মানুষের কর্মক্ষমতা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী মাদকাসক্তির ফলে শরীরে ও মনে যে প্রভাব পড়ে তা ভয়াবহ:
• শারীরিক ক্ষতি: মাদক সেবনের ফলে কিডনি বিকল হওয়া, হার্টের সমস্যা, লিভার সিরোসিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ ঘটে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার শারীরিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
• মানসিক ক্ষতি: মাদকের প্রভাবে মস্তিস্কের কোষ নষ্ট হয়ে যায়, স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বিষণ্ণতা, সিজোফ্রেনিয়া এবং আত্মহত্যার প্রবণতা মাদকসেবীদের মধ্যে প্রবলভাবে দেখা যায়।
• মৃত্যু ঝুঁকি: মাদকসেবীর অকাল মৃত্যু অনিবার্য। এটি কেবল ব্যক্তিকে মারে না, বরং তিল তিল করে একটি সাজানো সংসারকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক পরিবার পথের ভিখারি হয়ে যায়।
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম এবং প্রধান রণক্ষেত্র হলো পরিবার। পরিবার হলো একটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের পরিবারগুলোতে মাদকের কুফল নিয়ে তেমন কোনো খোলামেলা আলোচনা হয় না। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, রাতে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কি না—এসব দিকে বাবা-মায়ের কড়া নজর রাখা প্রয়োজন। পিতা-মাতার উদাসীনতার সুযোগেই অনেক সময় সন্তান বিপথে যায়।
কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া ‘ঐশী’র সেই নৃশংস ঘটনার কথা আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি। মাদক কীভাবে একজন সন্তানকে তার জন্মদাতা পিতা-মাতাকে হত্যা করতে প্ররোচিত করতে পারে, তা ছিল এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। এমন বহু ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের মতো অপরাধের একটি বড় কারণ হলো মাদকের টাকা জোগাড় করা। সন্তান যদি নেশায় আসক্ত হয়েই পড়ে, তবে সেটি গোপন না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা
আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ ধর্মীয় মূল্যবোধ মেনে চলে। ইসলামসহ সকল ধর্মেই মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্যকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে নেশার এত প্রসার হওয়া সম্ভব নয়। মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় নেতারা যদি নিয়মিত বয়ানে মাদকের বিষক্রিয়া, এর সামাজিক কুফল এবং ধর্মীয় পরিণতির কথা তুলে ধরেন, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যদি সোচ্চার হন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করেন, তবেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা আজ কেবল সময়ের দাবি।
পরিবারের পরেই মানুষের মূল্যবোধ তৈরিতে প্রধান স্থান হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, একজন শিক্ষার্থীকে সচেতন ও নৈতিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা শিক্ষকদের দায়িত্ব। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা এবং মাদকের কুফল নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীরা যখন বুঝতে পারবে যে নেশা কেবল স্বাস্থ্য নয়, বরং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে, তখন তারা নিজেরাই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মাঝে নিয়মিত শপথ অনুষ্ঠান হওয়া উচিত যেখানে তারা বলবে—“আমরা কখনো নেশাগ্রস্ত হবো না, যারা নেশা করে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবো না এবং সম্ভব হলে অন্য কেউ এই পথে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনব।” শিক্ষকদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে মাদক মুক্ত রাখা একান্ত জরুরি।
আমরা প্রায়ই সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা শুনি। কিন্তু যুবসমাজকে যদি বাস্তবসম্মতভাবে মাদকমুক্ত করতে না পারি, তবে এসব ঘোষণা শুধুই ফাঁকা বুলিতে পরিণত হবে। মাদক নির্মূলে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. সীমান্ত সুরক্ষা: পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে মাদক আসা বন্ধে সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ২. গডফাদারদের বিচার: ছোটখাটো বাহকদের বদলে মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা: সরকারি-বেসরকারি যেকোনো চাকরিতে নিয়োগের আগে ‘ডোপ টেস্ট’ বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি যেন কোনোভাবেই চাকুরির যোগ্য বলে বিবেচিত না হয়। ৪. চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে রোগী হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিটি জেলায় মানসম্মত সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
মাদক কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। আজ যে যুবকটি নেশায় আসক্ত, সে হয়তো আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক বা সমাজসেবক হতে পারত। মাদকের কারণে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদ হারাচ্ছি। তাই সুন্দর সমাজ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে একসাথে কাজ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, নেশাগ্রস্ত মানুষ দ্বারা সমাজের কোনো কল্যাণ সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদী নেশা মানুষের কর্মশক্তি ও মেধা ধ্বংস করে দেয়। আমরা যদি একটি উন্নত ও মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, তবে মাদককে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই একটি নিরাপদ ও সুন্দর দেশ গড়া সম্ভব। আসুন, আমরা আজই প্রতিজ্ঞা করি—নিজে মাদক থেকে দূরে থাকব এবং অন্যকেও এই মরণনেশা থেকে দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করব। তবেই সার্থক হবে আমাদের সোনার বাংলার স্বপ্ন।
লেখক : সাবেক প্রধান নির্বাহী, প্রশিকা।
আমার বার্তা/সিরাজুল ইসলাম/এমই

