
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি কমে যাওয়া ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্রমবর্ধমান চাপ। এই বাস্তবতায় কৃষিকে টেকসই, লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তরের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক ড. মো. সহিদুজ্জামান মনে করেন, আধুনিক কৃষি ও স্মার্ট এগ্রিকালচারের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।
বাংলাদেশের কৃষি কেবল ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদও গভীরভাবে যুক্ত। এই তিনটি উপখাতের সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রম সংকট কৃষিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট কৃষি সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
স্মার্ট কৃষি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এটি কৃষিকে দক্ষ, টেকসই ও লাভজনক করার একটি আধুনিক দর্শন। এর মাধ্যমে কৃষক সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে উৎপাদন বাড়ে, অপচয় কমে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক করে তোলাই স্মার্ট এগ্রিকালচারের মূল লক্ষ্য। এখানে সেন্সর, ড্রোন, স্যাটেলাইট ইমেজিং, জিপিএস, ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালাইটিক্স ব্যবহার করা হয়। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পুষ্টিগুণ কিংবা রোগবালাই সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যায়। ফলে কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী সার, সেচ ও কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন। এতে খরচ যেমন কমে, তেমনি পরিবেশ দূষণও হ্রাস পায়।
আধুনিক কৃষি মূলত উচ্চফলনশীল জাত, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে স্মার্ট কৃষি নির্ভুল ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়। মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে যতটুকু সার প্রয়োজন ততটুকুই প্রয়োগ করা যায়। এতে অপচয় কমে এবং উৎপাদন বাড়ে। একইভাবে বায়োচার, জৈব সার ও মাইক্রোবিয়াল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব। এই দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির ভিত্তি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন পূর্বাভাস, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা কীটপতঙ্গের আক্রমণ আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন। কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতা আসবে।
অনেকের আশঙ্কা, স্মার্ট কৃষি চালু হলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রযুক্তিনির্ভর বাণিজ্যিক কৃষি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে অনেকেই কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, ফলে অনাবাদি জমির পরিমাণ বাড়ছে। স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তরুণরাও কৃষিতে আগ্রহী হবে এবং অনাবাদি জমিও উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তবে বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। দেশের অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল। এছাড়া অধিকাংশ কৃষক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষিত নন। আরেকটি বড় বিষয় হলো খণ্ডিত জমি। ছোট ছোট জমিতে ড্রোন বা আধুনিক যন্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। তাই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।
ড. মো. সহিদুজ্জামান বায়োচার ও ন্যানো প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে “বিসিসিটি-বাউ বায়োচার চুলা” উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই চুলার মাধ্যমে কৃষক রান্নার সময় বিনামূল্যে উন্নতমানের বায়োচার উৎপাদন করতে পারেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে প্রায় ৭৮ শতাংশ অজৈব কার্বন রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় উন্নত। বায়োচার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা বাড়ে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়। পাশাপাশি এটি কার্বন সংরক্ষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বায়োচার থেকে ন্যানো-ফিড উৎপাদন করা সম্ভব, যা গবাদিপশুর মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, বাণিজ্যিক ও গবেষণাভিত্তিক করতে হবে। রিমোট সেন্সিং, ড্রোন, এআই, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং প্রিসিশন কৃষির সমন্বিত প্রয়োগ কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক করতে পারে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে গবেষণার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ কৃষিতে বিশ্বমানের অবস্থানে উন্নীত হতে পারবে।
কৃষির আধুনিকায়নই বাংলাদেশের টেকসই সমৃদ্ধির প্রধান সম্ভাবনা। আর স্মার্ট কৃষির সফল বাস্তবায়নই পারে দেশকে প্রকৃত স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে।
লেখক: অধ্যাপক, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
আমার বার্তা/ড. মো. সহিদুজ্জামান/এমই

