
একসময় মানুষের কাছে দূরত্ব মানেই ছিল অপেক্ষা। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা হবে, দুটো কথা হবে, মুখোমুখি বসে হাসি কিংবা অভিমান ভাগ করে নেওয়া যাবে, এই আশাতেই কেটে যেত দীর্ঘ সময়। এখন দূরত্ব যেন আর কোনো বাধাই নয়। একটি মুঠোফোন, একটি ইন্টারনেট সংযোগ আর কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ থাকলেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
অথচ অদ্ভুতভাবে, যোগাযোগের এই অভাবনীয় সহজলভ্যতার যুগেই মানুষ যেন একে অপরের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সম্পর্ককে সহজ করেছে, সন্দেহ নেই। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া, দূরে থাকা স্বজনের খোঁজ নেওয়া কিংবা বিপদের সময়ে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভাচ্যুয়াল যোগাযোগ বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। তখন পাশে বসে থাকা মানুষটির চোখের দিকে তাকানোর চেয়ে দূরের কারও স্ট্যাটাস দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকার তরুণদের মধ্যে একাকিত্বের চিত্র উঠে এসেছে। ‘স্পিড ফ্রেন্ডিং’ নামের একটি আয়োজনের মাধ্যমে অপরিচিত তরুণ-তরুণীরা সরাসরি বসে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। প্রতিবেদনের লেখকও জানিয়েছেন, ঢাকায় বন্ধুদের অনেকে বিদেশে চলে যাওয়ায় এবং নতুন বন্ধুত্ব তৈরি না হওয়ায় তিনি এমন একটি আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন। ঘটনাটি আমাদের সময়ের এক অদ্ভুত বাস্তবতার কথা বলে। শত শত অনলাইন সংযোগ থাকা সত্ত্বেও মানুষ কখনো কখনো একজন সত্যিকারের শ্রোতা খুঁজে বেড়ায়।
অন্যদিকে, চলতি বছরের অক্টোবরে দ্য গার্ডিয়ান-এর একটি প্রতিবেদনে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা একাকিত্বকে ‘lonely generation হিসেবে আলোচিত করা হয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ালেও অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তব সম্পর্কের জায়গা পূরণ করতে পারছে না। কারও পোস্টে একটি লাইক, ছবিতে একটি প্রতিক্রিয়া কিংবা কয়েকটি অনলাইন বার্তা হয়তো মুহূর্তের জন্য সংযোগের অনুভূতি তৈরি করে, কিন্তু গভীর সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন যে সময়, মনোযোগ ও উপস্থিতি, তা কেবল স্ক্রিন দিয়ে পূরণ করা কঠিন।
বাংলাদেশের বাস্তবতাতেও বিষয়টি নতুন নয়। প্রথম আলোর এক তারুণ্য জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের বড় একটি অংশ জানিয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও অনেকে সামনাসামনি কথোপকথনের বদলে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকছেন। অর্থাৎ একই ঘরে থেকেও মানুষ যেন আলাদা আলাদা ভার্চ্যুয়াল ঘরে বসবাস করছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে কেবল সম্পর্ক নষ্ট করে, বাস্তবতা তার চেয়ে জটিল। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত একটি ঘটনাই তার প্রমাণ। মানিকগঞ্জের এক ব্যক্তি প্রায় তিন মাস নিখোঁজ থাকা স্ত্রীকে খুঁজে পান একটি ফেসবুক ভিডিওর মাধ্যমে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টই শেষ পর্যন্ত তাদের পুনর্মিলনের পথ তৈরি করে। অর্থাৎ মাধ্যমটি নিজে ভালো কিংবা খারাপ নয়; আমরা তাকে কীভাবে ব্যবহার করছি, আসল প্রশ্নটি সেখানেই।
সমস্যা তাই প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যাটি আমাদের ব্যবহারের অভ্যাসে। আমরা এখন অনেক সময় প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে তার অনলাইন উপস্থিতি দেখি। জন্মদিনে পাশে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা জানানোর বদলে একটি পোস্ট করি। বন্ধুর মন খারাপ বোঝার বদলে তার দেওয়া কোনো ইঙ্গিতপূর্ণ স্ট্যাটাসের অপেক্ষা করি। ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিট নির্ভার কথা বলার বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করি। সম্পর্ক তখন অনুভবের জায়গা থেকে প্রদর্শনের জায়গায় চলে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো এখানেই। এটি আমাদের মানুষের কাছে নিয়ে আসে, আবার একই সঙ্গে মানুষের কাছ থেকেই সরিয়ে দিতে পারে। কারণ ভার্চ্যুয়াল জগতে সম্পর্কের হিসাব খুব সহজ। কতজন বন্ধু, কতটি লাইক, কতটি মন্তব্য, কতজন অনুসারী। কিন্তু বাস্তব সম্পর্কের হিসাব এত সরল নয়। সেখানে প্রয়োজন ধৈর্য, ক্ষমা, মনোযোগ, উপস্থিতি এবং কখনো কখনো নীরবে পাশে বসে থাকার ক্ষমতা।
একটি পরিবারের সবাই যখন একই ঘরে বসে নিজ নিজ পর্দায় ডুবে থাকে, তখন ঘরটি হয়তো ভরা থাকে মানুষের উপস্থিতিতে, কিন্তু অনুপস্থিত থাকে সম্পর্কের উষ্ণতা। বন্ধুরা একই টেবিলে বসে থেকেও যখন প্রত্যেকে আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত, তখন আড্ডা থাকে, কিন্তু আন্তরিকতা থাকে না। ভালোবাসা তখন প্রকাশিত হয়, কিন্তু অনুভূত হয় না।
আমাদের তাই প্রযুক্তিকে ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন তার কাছে নিজেদের সমর্পণ না করা। প্রতিদিন কিছু সময় ফোনের বাইরে থাকা দরকার। পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, বন্ধুর পাশে বসা, প্রিয়জনের কথা মন দিয়ে শোনা, কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই কারও খোঁজ নেওয়া দরকার। কারণ একটি সম্পর্ক টিকে থাকে না শুধু ‘অনলাইনে আছো’ দিয়ে; সম্পর্ক বেঁচে থাকে ‘আমি আছি’ এই অনুভূতিতে।
স্ক্রিনের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, মানুষের চোখের উষ্ণতার বিকল্প সে কখনো হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমানোর দায়িত্ব এখনো আমাদেরই। তাই ভার্চ্যুয়াল পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকানো প্রয়োজন সেই মানুষগুলোর দিকে, যারা আমাদের পাশে সত্যিই ছিল, আছে এবং হয়তো নীরবে অপেক্ষা করছে।
কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলো কোনো নোটিফিকেশনে আসে না। সেগুলো তৈরি হয় সময় দিয়ে, যত্ন দিয়ে, উপস্থিতি দিয়ে। আর সেই সম্পর্কের রং যেন স্ক্রিনের অতিরিক্ত আলোয় ফিকে হয়ে না যায়, সেই দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
লেখক : শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল :tanjimhossen2705@gmail.com

